
ফুটবলকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কিন্তু বিশ্বকাপ কখনোই শুধু ফুটবল নয়। এটি সংস্কৃতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, জাতীয় পরিচয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতির এক বিশাল মিলনমেলা। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই সেই বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণ, ১০৪টি ম্যাচ, তিনটি আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—সব মিলিয়ে এটি হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। কিন্তু একই সঙ্গে এটি হয়তো সবচেয়ে বিতর্কিত ও রাজনৈতিক বিশ্বকাপও।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্য হলো, এটি সাধারণত মানুষকে একত্র করে। জাতি, ধর্ম, ভাষা কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে কোটি কোটি মানুষ একই আবেগে যুক্ত হয়। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের আগে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো দেখলে মনে হয় ফুটবল মাঠের বাইরের বাস্তবতা বারবার মাঠের ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নিঃসন্দেহে ইরান। বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেও ইরানকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে দলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। ইরানের খেলোয়াড়েরা শেষ পর্যন্ত ভিসা পেলেও হাজার হাজার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাননি। এমনকি বিশ্বকাপের গ্রুপ ড্র অনুষ্ঠানে দেশটির প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। একটি ফুটবল দল মাঠে খেলবে, অথচ তাদের সমর্থকদের বড় একটি অংশ স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকতে পারবে না—এমন দৃশ্য বিশ্বকাপের চেতনাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
ফিফা সবসময় দাবি করে এসেছে, রাজনীতি ও ফুটবল আলাদা বিষয়। বাস্তবে অবশ্য সেই বিভাজন কখনোই পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা, ২০১৮ সালের রাশিয়া কিংবা ২০২২ সালের কাতার—প্রতিটি বিশ্বকাপই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সমালোচকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া সংস্থার প্রধানের উচিত রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেকের কাছে সেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। যখন কোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হয়, তখন তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে অভিবাসন ইস্যুও এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয়। লক্ষ লক্ষ দর্শক বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবেন। অথচ একই সময়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, আইস অভিযানের খবর এবং কঠোর সীমান্ত নীতির কারণে উদ্বেগও বাড়ছে। ফুটবল এমন একটি খেলা যা অভিবাসী সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি কিংবা টরন্টোর মতো শহরে ফুটবলের প্রাণশক্তি মূলত অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। ফলে মাঠের উৎসবের সঙ্গে বাস্তব জীবনের উদ্বেগের এই বৈপরীত্য অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বিশ্বকাপের আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো টিকিটের মূল্য। সাধারণ মানুষের খেলা হিসেবে পরিচিত ফুটবল ক্রমেই ধনী দর্শকদের বিনোদনে পরিণত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন জোরালো হচ্ছে। ফাইনালের টিকিট কয়েক হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া কিংবা রিসেল মার্কেটে কয়েক দশ হাজার ডলারে পৌঁছে যাওয়া শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন নয়; এটি ফুটবলের সামাজিক চরিত্র নিয়েও বিতর্ক তৈরি করছে। যে খেলা একসময় শ্রমজীবী মানুষের আবেগ ছিল, সেটি কি ধীরে ধীরে করপোরেট পণ্যে পরিণত হচ্ছে?
তবে এত বিতর্কের মধ্যেও ফুটবলের শক্তিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত মানুষের হৃদয় জয় করে মাঠের খেলাতেই। ১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদান, ২০০২ সালে রোনালদো, ২০১০ সালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, ২০১৪ সালে জার্মানির উত্থান কিংবা ২০২২ সালে লিওনেল মেসির মহাকাব্যিক যাত্রা—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিতর্ককে ছাপিয়ে গিয়েছিল।
২০২৬ সালেও হয়তো সেটাই হবে। স্পেন, ফ্রান্স, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগাল—সবাই নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে। কোটি কোটি সমর্থক আবারও আশা করবে তাদের দেশের পতাকা সবচেয়ে উঁচুতে উড়বে। ফুটবলের জাদু আবারও মানুষকে এক করবে।
তবুও একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না। আধুনিক বিশ্বে বিশ্বকাপ আর শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি এখন বৈশ্বিক শক্তির প্রতিফলন, অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রদর্শন, সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম এবং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ারও একটি মঞ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
১৯ জুলাই নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন চ্যাম্পিয়নের হাতে ট্রফি উঠবে, তখন হয়তো বিশ্ব মনে রাখবে কে জিতল। কিন্তু একই সঙ্গে ইতিহাস এটাও মনে রাখবে যে এই বিশ্বকাপ ছিল এমন এক সময়ের আয়না, যখন ফুটবল, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা একে অপরের সঙ্গে অভূতপূর্বভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল।
আর এ কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি আমাদের সময়ের একটি প্রতিচ্ছবি।