যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের লাখো শিক্ষার্থী। উন্নত শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং পড়াশোনা শেষে কাজ করার সুযোগ—এসব কারণেই দেশটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই নতুন এক অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেখা দিয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (OPT) কর্মসূচির আওতায় কাজের অনুমতি পেতে ১ লাখ মার্কিন ডলার ফি আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, তবু বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
ওপিটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই এফ-১ (F-1) স্টুডেন্ট ভিসায় পড়াশোনা করেন। ডিগ্রি শেষ করার পর তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (OPT)। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পড়াশোনার বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত চাকরিতে যোগ দিতে পারেন।
সাধারণ বিষয়ে স্নাতকদের জন্য এই সুযোগ এক বছর পর্যন্ত, আর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত থাকে। এই সময়ে চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি অনেকেই পরে H-1B কর্মভিসায় রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পান।
কেন বিতর্ক?
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪ লাখ ১৯ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ওপিটির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছিলেন। নতুন করে ১ লাখ ডলার ফি চালু হলে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এই সুযোগ কার্যত নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
এখনো পরিষ্কার নয়, এই অর্থ শিক্ষার্থী দেবেন, নাকি বিশ্ববিদ্যালয় বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বহন করবে। বিষয়টি ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিতে (DHS) আলোচনায় রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য কী?
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অবৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন শর্ত আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে তাঁর প্রশাসন।
এর আগে H-1B কর্মভিসার ক্ষেত্রেও ১ লাখ ডলার ফি আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে আদালতের নির্দেশে সেই উদ্যোগ স্থগিত হয়ে যায়। এখন একই ধরনের আর্থিক বাধা ওপিটি কর্মসূচিতেও আনার চিন্তা করা হচ্ছে।
কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চ টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিক্ষা ঋণের চাপ সামলেই যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যান। এর সঙ্গে যদি আরও ১ লাখ ডলার যোগ হয়, তাহলে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য কিংবা ইউরোপের অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরও। বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আবেদন কমে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রকৌশল ও ফাইন্যান্স খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ দেয়।
আরও কী পরিবর্তনের ভাবনা?
ট্রাম্প প্রশাসন শুধু ওপিটির ফি নিয়েই ভাবছে না। শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর নিয়মেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে ওপিটির সময় পর্যন্ত স্টুডেন্ট ভিসা কার্যকর থাকলেও এখন আলাদাভাবে ভিসা নবায়নের আবেদন করতে হতে পারে।
এ ছাড়া বিদেশ থেকে গ্রিন কার্ডের আবেদনকারীদের জন্যও ১ লাখ ডলারের বন্ড বা জামানতের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে, যা নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এখন শিক্ষার্থীদের কী করা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ প্রস্তাবটি এখনো নীতিতে পরিণত হয়নি। হোয়াইট হাউসের অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে এটি কার্যকর হবে না।
তবে যারা আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের উচিত নিয়মিত সরকারি ঘোষণা অনুসরণ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা।
শেষ কথা
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা শুধু একটি ডিগ্রি নয়, বরং বৈশ্বিক ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম বড় সুযোগ। কিন্তু ওপিটির ওপর ১ লাখ ডলারের সম্ভাব্য ফি সেই সুযোগকে অনেকের জন্য কঠিন করে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নয়, বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষার প্রবাহের ওপরও পড়তে পারে।



