মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত সরকারকে আগে থেকে উদ্বেগ জানানোর পরেও এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা খেদ প্রকাশ করেছে।
গতকাল বুধবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদে ক্ষোভ ও খেদের কথা জানানো হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গতকাল বিকেলে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রথমে বক্তব্য এবং পরে প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কারাবাস বা আরও খারাপ কিছুর শঙ্কা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো অনুশোচনা কিংবা ভুল স্বীকার করার মানসিকতা দেখাননি।
দিল্লির এ অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান প্রথমে একটি রেকর্ড করা বক্তব্য দেন। পরে সরাসরি ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। তবে তখন কোনো কথা বলেননি। এ ছাড়া সশরীরে মঞ্চে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
এ সংবাদ সম্মেলনের পর ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানায়, পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। সেখানে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপনের দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রেখে দেশের জনগণ দৃঢ় সংকল্প নিয়েছে যে, জাতি আর কখনও ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দিনগুলোতে ফিরে যাবে না। বাংলাদেশ কখনও কোনো পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আর কোনো স্থান হবে না। সাজাপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তাঁর মাফিয়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনও স্থান পাবে না।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করা ইতিহাসের গতিপথ উল্টে দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা। শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীরা এ ধরনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ অতীতেও এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখনও তাই করছে। এতে বলা হয়, সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি গঠনমূলক, পারস্পরিক লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ আগ্রহী।
একই সঙ্গে ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এখনও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, যে কোনো অজুহাতে তাঁকে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে গভীর আঘাত দিয়েছে এবং বাংলাদেশ-ভারতের সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
এর আগে গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় শেখ হাসিনা যাতে দিল্লি থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে বা কর্মকাণ্ড না চালাতে পারেন, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
একই দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আমারসিলেট/হা



