সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, হাঁটতেও পারেন না। দুই পা যেন অচল, বাঁ হাতেও নেই শক্তি। তাই ডান হাত ও ডান পায়ের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়েই চলাফেরা করেন দিনমজুর পরিবারের প্রতিবন্ধী কন্যা মনা বেগম (২০)। প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ এভাবে পাড়ি দিয়ে বাসে উঠতেন, এরপর যেতেন কলেজে। রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন, শরীর ভেঙে পড়েছে-তবুও থামেনি তার পড়াশোনা।
অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে এবার এইচএসসি পাস করেছেন মনা। স্বপ্ন এখন ডিগ্রি সম্পন্ন করে সরকারি চাকরি করা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কাছে তার সেই স্বপ্ন যেন থমকে গেছে। অর্থের অভাবে এখনও ডিগ্রি প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। সেপ্টেম্বরেই লেট ফি দিয়ে ভর্তির সুযোগ শেষ হওয়ার কথা থাকায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মনা ও তার পরিবার।
মনা বেগম মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর বাগানের দিনমজুর হারিছ মিয়া ও আমিনা বেগমের মেয়ে। পাশের ফুলতলা ইউনিয়নের শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ২ দশমিক ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠছেন মনা। বাঁ হাত, বাঁ পা ও কোমরে শক্তি না থাকায় নিজের পায়ে দাঁড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। দৈনন্দিন চলাফেরায় তাকে হামাগুড়ি দিতে হয়। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তার লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে প্রতিদিনই ছিল তার কঠিন সংগ্রাম। বাড়ি থেকে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হতো গাড়িতে ওঠার জন্য। কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও একই পথ পাড়ি দিতে হতো। এতে অনেক সময় শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ত যে শ্বাস নিতে কষ্ট হতো বলে জানান মনা।
মনা বেগম বলেন, ‘জন্ম থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। পায়ে হাঁটতে পারি না। হাতের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করি। এভাবেই অনেক কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু ভর্তির টাকা ও বই কেনার মতো সামর্থ্য আমার নেই।’
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মনা বলেন, ‘আমি পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চাই। লেখাপড়া চালিয়ে যেতে আমার একটি ছোট চাকরি প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে কোনো চাকরি পাচ্ছি না। আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলে আমি নিজের খরচ নিজেই চালানোর চেষ্টা করব।’ সহজে চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা এবং পরিবারের জন্য একটি ভালো ঘরের আকাক্সক্ষাও জানিয়েছেন মনা। তার ভাষ্য, একটি অটোরিকশা থাকলে কলেজে যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমে যেত।
মনার মা আমিনা বেগম বলেন, ‘আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি, লেখাপড়া করিয়েছি। এখন অর্থের অভাবে আর পড়াতে পারছি না। মেয়েটার যদি একটি অটোরিকশা থাকত, তাহলে সে নিজে চলাফেরা করতে পারত।’
জুড়ীর সামসুদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন চাষা মনার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘মনা আমার বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খুব ভালো ছাত্রী ছিল। লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে অনেক কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করত। সব বাধা পেরিয়ে সে এসএসসি ও এইচএসসির গণ্ডি পেরিয়েছে। ডিগ্রি সম্পন্ন করে সে সরকারি চাকরি করতে চায়।’ মনার স্বপ্নপূরণে বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন এই শিক্ষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *