হুমকির মুখে মৌলভীবাজারের শান্ত পরিবেশ। ১২ আগষ্ট একই দিনে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ৩টি স্পটে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ায় প্রতিপক্ষকে প্রাণে হত্যার উদ্দেশ্যে ৩টি হামলা। এই হামলার ঘটনায় আহতরা হাসপালের বেডে এখন জীবন মরণ সন্ধিক্ষণে। ওই ঘটনাগুলোর ভিডিও ও ছবি স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল। এই ট্রিপল হামলার ঘটনা এখন ‘টক অবদ্যা টাউন’।
এমন ভয়ংকর দৃশ্যে শহর জুড়ে আতঙ্ক বাড়ছে। চরম উৎকন্ঠায় শিক্ষার্থী,অভিভাবক ও সচেতন মহল। হঠাৎ করে শান্ত ও শান্তির এই জেলা শহরে অশান্তির এক নতুন উপদ্রব। মাথাছাড়া দিয়ে উঠা এই উপদ্রব আর আতঙ্কের নাম ‘কিশোর গ্যাং’ এমনটি বলছেন ভুগতভোগি ও শহরের বাসিন্দারা। তবে পুলিশ বয়সের সংজ্ঞায় ওদেরকে স্রেফ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলতে নারাজ। পুলিশ বলছে এদের পরিচয় উঠতি সন্ত্রাসী বা কেবলই সন্ত্রাসী।
এবিষয়ে ভুগতভোগিরা বলছেন সব বয়সের সম্বলিত গ্যাংই এখন কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এখন দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে এই সন্ত্রাসীরা। নিজেকে জড়াচ্ছে অনলাইন জুয়া,ইভটিজিং,মাদক সেবন ও মাদক ক্রয় বিক্রয়ে।
ভাড়ায় টার্গেট কিলিং,চুরি ও ছিনতাইয়েও যুক্ত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান জোরালো ভূমিকা না থাকায় দিন দিন বেসামাল হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বা উঠতি সন্ত্রাসীরা এমনটি বলছেন শহরের বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন কিশোর আর উঠতি সন্ত্রাসী যাই হোক প্রশাসনের নাকের ডগায় কারা এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে? নেপথ্যের ‘গডফাদার’রাই বা কারা? অলিগলিতে এখন ওদের দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে মৌলভীবাজারের শান্ত পরিবেশ। তারা বলছেন উঠতি বয়সীরা সাইলেন্সার বিহীন প্রাইভেট কার আর মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত গতিতে মহড়া দেয়। উচ্চ শব্দের হরণ আর সাইলেন্সারের বিকট শব্দে তারা ভয়ভীতির সৃষ্টি করে। তাদের বয়সী কিংবা অন্যদের সাথে কারণে অকারণে ঝগড়া করে। এরপর প্রতিপক্ষের ওপর অস্ত্রের মহড়ায় দলবেঁধে আক্রমণ চালায়। সাম্প্রতিক সময়ে শহরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে।
চলতি বছরের ২রা আগষ্ট আমার সিলেট নিউজ ডটকমে মৌলভীবাজারে ‘ইভটিজিং ও কিশোর গ্যাং হটস্পট’ শিরোনামে একটি নিউজ প্রকাশ হয়েছিলো। ওই নিউজে যে স্পটগুলোর কথা বলা হয়েছিলো ওই স্পটেই ঘটে হামলার ঘটনা।
ভুগতভোগীরা বলছেন এই স্পট গুলোতে পুলিশের টহল থাকলে এই ঘটনাগুলো ঘটত না। গেল বছর শহরে পৌরসভা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হন এডভোকেট সুজন মিয়া। এদের এমন কার্যক্রলাপ থামাতে কঠোর হয়ে নামছে পুলিশ। সম্প্রতি জেলা পুলিশের উদ্যোগে আয়োজিত শহরের শিল্পকলা একাডেমির অডিটরিয়ামে পুলিশ-নাগরিক মতবিনিময় সভায় এমনটি জানানো হয়। কিন্তু এই ঘোষনার বাস্তবায়ন না থাকায় এই অপরাধীরা আরও বেপরোয়া। তবে বুধবারের ট্রিপল ঘটনার পর পুলিশ এদের ধরতে বেশ নড়ে চড়ে বসেছে।
মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্যও কিশোর গ্যাংয়ের নামে চলা সন্ত্রাস কার্যকলাপ নির্মূলে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সামনে কিশোর গ্যাং নির্মূলে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সর্বস্তরের নাগরিকদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন,প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
যে সব স্পটে কিশোর গ্যাং বা উঠতি সন্ত্রাসীদের আড্ডা
শহরের চৌমহনা, চাঁদনীঘাট বাস ও সিএনজি স্ট্যান্ড এলাকায়, সমশেরনগর রোড সিএনজি স্ট্যান্ড এলাকায়,প্রেসক্লাব মোড়,পৌরসভার দুই গ্রেইটের সামন,সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের মার্কেট ও আশপাশ,হাফিজা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশ। কুসুমবাগ পয়েন্ট,বড়হাট,মনুব্যারেজ,শান্তিভাগ ওয়াকওয়ে,কুদালীছড়াওয়াকওয়ে,ওয়াবদাপয়েন্ট,শহরের বিভিন্ন মার্কেটের সামন,ঢাকা বাসস্ট্যান্ড,বেরিরপাড় পয়েন্ট,বড়কাপন,বেরিরচর,আব্দুল মালিক উচ্চ বিদ্যালয় মোড়,গোবিন্দশ্রী সড়কের আশপাশ,পাগুলিয়া এলাকা,পৌর ঈদগাহের আশপাশ,বড়হাট নদীর পাড়,মনু নদীর শহর এলাকার উভয় পাড় কিছু স্থানে,অনেক পাড়া মহল্লার প্রবেশদ্বারসহ বিভিন্নস্থানে জড়ো হয়ে তারা আড্ডা দেয়। এমন তথ্য স্থানীয়দের।
‘বড় ভাই’ না বলায় হামলা
উঠতি সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত এক কিশোর শিক্ষার্থী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। পূর্ববিরোধের জেরে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসারা ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসান আহমদ। জানা যায় শহরের কুসুমবাগ এলাকায় বুধবার রাত ৯টার দিকে তার ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। স্থানীয়রা তাকে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হওয়ায় এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবার জানায় শহর থেকে প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার পথে কুসুমবাগে কয়েকজন অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হাসানের পথরোধ করে। ‘বড় ভাই’ বলা নিয়ে তর্কের এক পর্যায়ে তারা হাসানের ওপর চড়াও হয় এবং চাকু দিয়ে আঘাত করে। তাদের অতর্কিত হামলায় তার গলা ও শ্বাসনালি কেটে যায়। প্রস্রাবের নালি ছিঁড়ে যায়। মুখ থেঁতলে যায়। বুকের পাঁজরও ভেঙে যায়। পরিবারের সদস্যরা জানান উঠতি সন্ত্রাসী কিশোর গ্যাং লিডার সানি মিয়া (কনকপুর ইউপির রায়পুর গ্রামের আলিম মিয়ার পুত্র),তাওহিদ ও রনির সঙ্গে হাসানের এক বন্ধুর পূর্ববিরোধ ছিল। সাানি তাকে ‘বড় ভাই’ বলে সম্বোধন করার জন্য চাপ প্রয়োগ করত। হাসান এ বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়ায় হুমকি দেওয়া হয় এবং এই নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়।
এই ঘটনায় হাসানের পিতা মো: মিন্টু মিয়া বাদী হয়ে সানি মিয়া (২০) সহ ১০ জনের নাম উল্লেখপূর্বক আরও ৪/৫ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে মৌলভীবাজার মঢেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
ডেকে নিয়ে হামলা
শহরের ৮নং ওয়ার্ডের ধরকাপন এলাকার বাসিন্দা মো: আব্দুল জব্বার মিয়ার ছেলে হাবিবুর রহমান রাব্বি (মন্টু মিয়া) (২১) বুধবার রাতে শহরতলী পাগুলিয়া এলাকায় ইনডোর স্টেডিয়ামে খেলা শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাকে ডেকে নিয়ে এক ব্যক্তির ছবি দেখানো হয়। বলা হয় লোকটিকে সে চিনে কিনা। হ্যাঁ বলার সাথে সাথে তার ওপর একদল উঠতি সন্ত্রাসীরা ধারাল অস্ত্র দিয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করে। এবিষয়ে সোহাগ মিয়া (১৯)কে প্রধান আসামী করে ৭ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ২/৩ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা জন্য লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ভুগতভোগির স্বজনরা।
শহরের চৌমহনা এলাকায় হামলা
১২ আগষ্ট বুধবার বিকেলে শহরের চৌমহনা এলাকায় সমশের নগর রোডে কয়েকজন অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় প্রতিপক্ষের উপর। এই হামলায় ৩-৪ জন গুরুতর আহত হন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এই হামলার ঘটনায় মেহদি হাসান রনি (২০) বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ২/৩ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন।
মৌলভীবাজার মডেল থানার ওসি মো: সাইফুল ইসলাম জানান পুলিশ দুটি মামলায় এপর্যন্ত ৩ জনকে আটক করেছে। অন্যদেরকে গ্রেফতার করতে তৎপর রয়েছে। সকলের সহযোগিতায় পুলিশ এসকল সন্ত্রাসীদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর।
এবিষয়ে পুলিশ সুপার মো: মনিরুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন মৌলভীবাজারে কোনো কিশোর গ্যাং নেই। যারা এরকম ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা সন্ত্রাসী। মৌলভীবাজারে লোকজন কথায় কথায় মুখস্ত কথা পেয়ে গেছে কিশোর গ্যাং আর সাইলেনসার বিহীন মোটরসাইকেল নিয়ে ওরা ঘুরে। তিনি জানতে চান কবে কোথায়। যখন এবিষয়ে নির্দিষ্ট করে বলা হয়,তখন তিনি কথা ঘুরিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন করে দেন।
আমারসিলেট/হা



