রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিং, ৩য় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট। সেখান থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের আলোচিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুন (১৯) এর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, দুপুরে গাজী নজরুল দুই স্ত্রীকে নিয়ে একসাথে খাবার খেয়েছেন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সবাই আলাদা কক্ষে যান। বিকেল ৫টার পর ডাকতে গিয়ে দেখা যায় দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, জানালা দিয়ে দেখা যায় ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলছেন মরিয়ম। পুলিশ প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে, তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে।
লক্ষণীয় যে, গত জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সে আলোচনায় আসে। তখন গাজী নজরুল তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন, জামায়াত তাকে ‘নৈতিক স্খলনের’ দায়ে বহিষ্কার করে। ১৯ বছরের একটা মেয়ে — হঠাৎ করে সারাদেশের ট্রল, গালি, বিচারের কাঠগড়ায়।
তার মৃত্যুর পেছনে আসল কারণ কী?
পুলিশ তদন্ত করছে। কিন্তু যদি এটা আত্মহত্যাও হয়, তাহলে আমাদের সমাজের জন্য এটা একটা বড় প্রশ্ন।
মরিয়ম খাতুনের (১৯) মৃত্যুটা শুধু একটা আত্মহত্যা না, এটা একটা সিস্টেমের খুন। এখানে তিনটা দায় আছে — ব্যক্তি গাজী নজরুলের দায়, দল হিসেবে জামায়াতের দায়, আর আমাদের সমাজের দায়।
পুলিশ বলছে, দুপুরে গাজী নজরুল দুই স্ত্রীকে নিয়ে একসাথে ভাত খেয়েছেন, বিকেলেই দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত লাশ। এখন তিনি ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে।
যে প্রশ্নগুলো এড়ানো যাবে না: ১৯ বছরের একটা মেয়েকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে রাখা — তার নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যের দায়িত্ব কার ছিল?
জুলাই মাসে যখন তাদের ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল হলো, তখন গাজী নজরুল নিজেই মিডিয়ার সামনে এসে মরিয়মকে “দ্বিতীয় স্ত্রী” পরিচয় দিয়েছিলেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি কি একবারও ভেবেছিলেন, এই পরিচয়ে ১৯ বছরের মেয়েটা সমাজে কীভাবে টিকবে?
ভিডিও ভাইরালের পর থেকে মেয়েটা ছিল চরম ট্রল ও সামাজিক বুলিংয়ের শিকার। সেই সময় তাকে কাউন্সেলিং, পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে নিরাপদ রাখা — এগুলো করার দায়িত্ব তো স্বামীরই ছিল।
পুলিশ এখন তদন্ত করছে এটা আত্মহত্যা নাকি আত্মহত্যায় প্ররোচনা, বা অন্য কিছু। যদি আত্মহত্যাও হয়, তাহলে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায় আসে।
জামায়াত বলছে, তারা “নৈতিক স্খলনের” দায়ে জুলাই মাসেই গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো — বহিষ্কার করলেই কি দায় শেষ?
গাজী নজরুলকে সাতক্ষীরা-৪ আসনে মনোনয়ন কে দিয়েছিল? তার অতীত, চরিত্র যাচাই না করে কিভাবে এমপি বানানো হলো?
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জামায়াত শুধু বহিষ্কার করে দায় সেরেছে, কিন্তু ভুক্তভোগী মেয়েটার জন্য দল হিসেবে কী করেছে? ইসলামী দল হিসেবে জামায়াতের কি উচিত ছিল না মেয়েটার পুনর্বাসন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা?
আজ যখন মরিয়মের লাশ ন্যাম ভবনে ঝুলছে, তখন জামায়াতের উচিত প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বলা — এই মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত চাই, এবং যদি দলের সাবেক নেতার কোনো গাফিলতি থাকে, তার বিচার চাই। শুধু “বহিষ্কৃত” বলে হাত ধুয়ে ফেললে হবে না। কারণ মেয়েটা বহিষ্কারের আগেই তার স্ত্রী হয়েছিল।
একজন সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রী ন্যাম ভবনে থাকেন — তার তথ্য স্পিকার ও সংসদ সচিবালয়ের কাছে ছিল কি? ১৯ বছরের একটা মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এভাবে সরকারি আবাসনে রাখা হলো কিভাবে?
আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, এটা ঠিক। কিন্তু একটা ১৯ বছরের মেয়েকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া যেখানে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না — সেটা কি হত্যার চেয়ে কম?
মরিয়ম হয়তো ভেবেছিল মরে গেলে বেঁচে যাবে। কিন্তু সে বাঁচেনি, আমাদের সবাইকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে গেছে।
সচেতন মহলের দাবি,পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক তদন্তে মৃত্যুর আসল কারণ বের করতে হবে — এটা আত্মহত্যা, না প্ররোচিত আত্মহত্যা, না হত্যা।
গাজী নজরুলের কল রেকর্ড, মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে।
জামায়াতকে দল হিসেবে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে।
একটা জীবনের দাম একটা এমপি পদ বা একটা দলের ভাবমূর্তির চেয়ে অনেক বেশি।১৯ বছরের মরিয়ম হয়তো ভেবেছিল — মরে গেলেই সব অপমান, সব কষ্ট শেষ। কিন্তু সে শেষ হয়নি, বরং শুরু হলো। তার পরিবারের জন্য আজীবনের কান্না রেখে গেল। যে সমস্যার জন্য সে চলে গেল, সেই সমস্যার সমাধান হলো না, বরং আরও একশোটা নতুন সমস্যা তৈরি হলো — মামলা, তদন্ত, মিডিয়া ট্রায়াল।



