কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্র বারবার বিকল: অবহেলার খেসারত দিচ্ছে সিলেট

কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্র বারবার বিকল: অবহেলার খেসারত দিচ্ছে সিলেট

সিলেটের কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্র। নামটা এখন সিলেটবাসীর কাছে উন্নয়নের প্রতীক নয়, বিরক্তি আর ভোগান্তির প্রতিশব্দ। মাসে দুইবার, কখনো সপ্তাহে দুইবার। একটু বৃষ্টি, একটু বাতাস, কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই — হঠাৎ বিকল। আর তার পরিণামে পুরো সিলেট বিভাগ অন্ধকার। এই কি একটি বিভাগীয় শহরের প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার চিত্র হতে পারে? প্রশ্নটা এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্ন।

গত এক বছরের পরিসংখ্যান দেখলেই চিত্রটা পরিষ্কার। কুমারগাঁও ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে সিলেটের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। অথচ এই কেন্দ্রটি এখন সবচেয়ে অনির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হয়েছে। কখনো ট্রান্সফরমারে ত্রুটি, কখনো ব্রেকারে আগুন, কখনো পুরোনো সঞ্চালন লাইনে ফল্ট — অজুহাতের শেষ নেই। কিন্তু সমাধানের কোনো স্থায়ী উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সিলেট অঞ্চলের কর্মকর্তারা প্রতিবারই বলেন, ‘কারিগরি ত্রুটি’, ‘মেরামত চলছে’, ‘শিগগিরই স্বাভাবিক হবে’। এই শিগগির আর শেষ হয় না।

আমরা জানতে চাই, কেন বারবার একই জায়গায় ত্রুটি? কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি কত বছরের পুরোনো? এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা কোথায় যায়? একটি গ্রিড উপকেন্দ্রের নিয়মিত প্রিভেন্টিভ মেইনটেন্যান্স হওয়ার কথা, থার্মাল স্ক্যানিং হওয়ার কথা, লোড ম্যানেজমেন্ট হওয়ার কথা। সেসব কি হয়? নাকি যন্ত্র বিকল না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়, তারপর তড়িঘড়ি করে জোড়াতালি দেওয়া হয়? সিলেটের মানুষের অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়টাই বলে।

এই বিকল হওয়ার খেসারত কে দিচ্ছে? দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

সিলেট এখন আর শুধু চা আর পর্যটনের শহর নয়। এটি দেশের দ্বিতীয় লন্ডন, রেমিট্যান্সের প্রাণকেন্দ্র। এখানে হাজার হাজার ছোট-বড় শিল্প, আইটি পার্ক, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। কুমারগাঁও একবার বিকল হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে জেনারেটরের ওপর ভরসা করতে হয়, আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, অনলাইন ফ্রিল্যান্সারদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়, যারা ঘণ্টা হিসেবে ডলার গোনেন। ব্যবসায়ীদের ফ্রিজের মাছ-মাংস পচে যায়, দোকানে বিক্রি বন্ধ। এই ক্ষতির হিসাব কি বিপিডিবি কখনো করেছে?

সবচেয়ে বড় তামাশা হলো, সিলেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় চাহিদার চেয়ে বেশি। কুমারগাঁও, শাহজিবাজার, বিবিয়ানা — সব মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ১০০০ মেগাওয়াটের বেশি, যেখানে সিলেট বিভাগের চাহিদা ৫০০-৬০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু সঞ্চালনের রাস্তা বন্ধ। উৎপাদন করে কী লাভ, যদি ঘরে পৌঁছানোর আগেই গ্রিড মুখ থুবড়ে পড়ে? এটি অনেকটা ফসল ফলিয়ে গুদামে পচানোর মতো। পরিকল্পনার এই দৈন্যতা লজ্জাজনক।
কুমারগাঁওয়ের এই দুরবস্থার পেছনে তিনটি কারণ প্রধান।প্রথমত, পুরোনো অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ১৯৬০-এর দশকে স্থাপিত এই কেন্দ্রের অনেক যন্ত্রাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ১৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল প্ল্যান্ট হলেও তার সুইচগিয়ার, ট্রান্সফরমার ও সঞ্চালন লাইন এখনো সেকেলে। লোড বেড়েছে তিন গুণ, কিন্তু গ্রিডের সক্ষমতা বাড়েনি। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবলের অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা। অভিযোগ আছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে মাসের পর মাস পড়ে থাকে। টেন্ডারবাজি, কেনাকাটায় অনিয়মের কথাও শোনা যায়। একটি স্পর্শকাতর স্থাপনায় যেখানে বিশ্বমানের প্রকৌশলী থাকার কথা, সেখানে লোকবল সংকটে চলছে দায়সারা কাজ।

তৃতীয়ত, বিকল্প ব্যবস্থার অভাব। একটি বিভাগীয় শহরের জন্য একটি মাত্র প্রধান গ্রিডের ওপর নির্ভরতা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সিলেটে দ্বিতীয় গ্রিড বা রিং সিস্টেম কেন আজও পুরোপুরি কার্যকর হলো না? বরিশাল, রংপুরের মতো নতুন বিভাগেও বিকল্প সঞ্চালন ব্যবস্থা আছে। সিলেটে নেই কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

আমরা মনে করি, এই সংকট আর কারিগরি সমস্যা নয়, এটি ব্যবস্থাপনার সংকট।

অবিলম্বে যা করতে হবে: কুমারগাঁও গ্রিডের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি অডিট করতে হবে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দিয়ে। অডিট রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনতে হবে।
পুরোনো ট্রান্সফরমার ও ব্রেকার দ্রুত প্রতিস্থাপন করতে হবে। জোড়াতালি নয়, স্থায়ী সমাধান চাই।
সিলেটের জন্য দ্বিতীয় ১৩২ কেভি গ্রিড এবং সঞ্চালন লাইনে রিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে একটি বিকল হলেও অন্যটি দিয়ে বিদ্যুৎ চালু থাকে।
প্রতিটি বিকলের ঘটনায় জনসমক্ষে ব্যাখ্যা দিতে হবে। কত ঘণ্টা লোডশেডিং হলো, কী কারণে হলো — তার স্বচ্ছ হিসাব দিতে হবে।

বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার। সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সিলেটের লাখ লাখ প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। সেই সিলেটকে অন্ধকারে রেখে উন্নয়নের গল্প শোনানো প্রহসন ছাড়া কিছু নয়।

আমরা আশা করি, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এবং বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কুমারগাঁওয়ের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে আর ‘ছোটখাটো ত্রুটি’ বলে এড়িয়ে যাবে না। সিলেটের মানুষ সমাধান চায়, আশ্বাস নয়। বারবার বিকল হওয়া এই কেন্দ্রের স্থায়ী সংস্কার না হলে সিলেটের মানুষকে নিয়ে এই অবহেলা একদিন বড় ক্ষোভে পরিণত হবে। তখন দায় কে নেবে?

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:২৮
  • ১১:৪৮
  • ৪:০৬
  • ৫:৫১
  • ৭:০৪
  • ৫:৪১