যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের যত অসম যুদ্ধকৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে না গিয়ে কম খরচে চাপ তৈরি করাই ইরানের অসম যুদ্ধকৌশলের মূল লক্ষ্য। ড্রোন হামলা, ছোট হামলাকারী নৌযান, মাইন, জাহাজে হামলা এবং ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে আঘাত—দীর্ঘদিন ধরেই এসব কৌশল ব্যবহার করে আসছে তেহরান। লক্ষ্য শুধু সামরিক ক্ষতি করা নয়; যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপ তৈরি করা এবং তাদের মধ্যে বিভেদও তৈরি করা।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে গ্রেপ্তার এবং ইসরাইলগামী একটি ফ্লাইদুবাই উড়োজাহাজের ককপিটে হামলার পর আবার আলোচনায় এসেছে ইরানের এই কৌশল। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা দুটি ঘটনায় ইরানের ভূমিকার ইঙ্গিত দিলেও শুক্রবার পর্যন্ত কোনো ঘটনার সঙ্গে ইরানের নিশ্চিত যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। যুক্তরাজ্যও বিমানঘাঁটির কাছে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি। ককপিটে হামলার সঙ্গেও ইরানের যোগসূত্রের কোনো প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন একজন কর্মকর্তা।

তবে ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনায় ইরানের ভূমিকা নিশ্চিত হলে তা হবে তেহরানের অসম যুদ্ধকৌশলের একটি বিপজ্জনক নতুন মাত্রা। আর যুক্তরাজ্যের ঘটনায় ইরানের যোগসূত্র প্রমাণিত হলে তা বিদেশে তুলনামূলক কম খরচে, পরোক্ষভাবে চাপ তৈরির দীর্ঘদিনের কৌশলেরই আরেকটি উদাহরণ হবে।

ইরানের অসম যুদ্ধকৌশল নতুন নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ আগের মিত্রদের সামরিক সহায়তা হারানোর পর তেহরান এই কৌশলের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধেও ড্রোনসহ বিভিন্ন অসম কৌশল ব্যবহার করে দেশটি। চলমান যুদ্ধেও সেই কৌশল আরও বিস্তৃত হয়েছে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেকারচি সম্প্রতি অসম যুদ্ধকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএতে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অসম যুদ্ধের অর্থ হলো শত্রুর ব্যয়বহুল ও ভারী অস্ত্রের মোকাবিলায় কম খরচের, সহজ কিন্তু কার্যকর সরঞ্জাম ব্যবহার করা এবং তাতে বিজয় অর্জন করা।

তেহরানের এই কৌশলের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিকগুলোর একটি হলো ড্রোন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—এমন আঞ্চলিক দেশগুলোতে ইরান ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড বা বড় সামরিক স্থাপনায় হামলা না করেও এ ধরনের আক্রমণের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতির খরচ ও ঝুঁকি বাড়ানো হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। ছোট হামলাকারী নৌযান ও মাইন ব্যবহার করেও প্রণালিতে হুমকি তৈরি করা হয়েছে। এতে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।

ইরানের কৌশলের আরেকটি বড় অস্ত্র হলো সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠী। ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দক্ষিণ লেবানন, ইয়েমেন, গাজা ও ইরাকে হামলা চালিয়েছে। এতে তেহরানকে সরাসরি প্রতিটি হামলার দায় নিতে হয় না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে রাখা সম্ভব হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে এই কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি উচ্চমাত্রার প্রচলিত যুদ্ধে ইরানের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন—এমন মূল্যায়ন রয়েছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখাই তেহরানের লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

দ্য সুফান সেন্টার চলতি বছরের শুরুতে এক বিশ্লেষণে বলেছিল, তেহরান বুঝতে পারে যে প্রচলিত ও তীব্র যুদ্ধে ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাই ইরান এমন এক অসম ও দীর্ঘস্থায়ী পাল্টা কৌশল নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে, যার লক্ষ্য নির্ণায়ক যুদ্ধজয় নয়; বরং টিকে থাকা ও সক্ষমতা ধরে রাখা।

বিদেশে পরোক্ষ হামলার অভিযোগ

ইরান সরাসরি সামরিক হামলার কিছু ঘটনা স্বীকার করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে হামলাও রয়েছে। তবে ব্রিটেনের বিমানঘাঁটির কাছে গ্রেপ্তার এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটে হামলার ক্ষেত্রে যে ধরনের ইরানি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, তা অনেক বেশি পরোক্ষ। এ কারণেই এসব অভিযোগ নিশ্চিত করা কঠিন এবং অস্বীকার করাও তুলনামূলক সহজ।

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর পর ইউরোপে বিভিন্ন অন্তর্ঘাতের ঘটনায় রাশিয়ার মদদের অভিযোগ উঠেছে। মস্কো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর সঙ্গেও এর মিল রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে অতীতেও বিদেশে এ ধরনের পরোক্ষ তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক ম্যাথিউ লেভিট গত বছর লিখেছিলেন, প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি কমাতে ইরানের এজেন্টরা তেহরানের নির্দেশে হামলা চালানোর জন্য অপরাধী গোষ্ঠীর সদস্যদের ভাড়া করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরানের মদদে অর্থের বিনিময়ে হত্যার একটি ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ করে। ওই ঘটনায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে একজন সরকারি কর্মকর্তা তাঁকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ইরান সরকার অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করে এবং এটিকে দুই দেশের সম্পর্ক জটিল করার ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করে।

যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারাও সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্সি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অগ্নিসংযোগ ও অন্যান্য হামলার অভিযোগ তুলেছেন। এসব হামলার অনেকগুলো ইহুদি সম্প্রদায় ও ইরানের ইসলামি শাসনের বিরোধীদের লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর প্রধান বলেছিলেন, তাঁর সংস্থা এক বছরে ইরানের মদদপুষ্ট ২০টির বেশি ‘সম্ভাব্য প্রাণঘাতী’ ষড়যন্ত্রের সন্ধান পেয়েছে।

ব্রিটেনে কয়েকটি উপাসনালয় ও ইহুদিদের ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কিশোর বয়সী কয়েকজনসহ বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব অপরাধের জন্য অনেক সময় অল্প পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কেউ কেউ ইরানের সঙ্গে তাঁদের কাজের যোগসূত্র সম্পর্কে খুব কম বা কোনো জ্ঞানই রাখেন না।

জুলাইয়ে ব্রিটেন ইসলামিক মুভমেন্ট অব দ্য কম্প্যানিয়নস অব দ্য রাইট বা আইএমসিআরকে নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরানের প্রক্সি হিসেবে কাজ করা এই গোষ্ঠী এসব হামলার পেছনে রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে অনলাইনে আত্মপ্রকাশ করা গোষ্ঠীটি বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে ইহুদিদের উপাসনালয়ে হামলার দায় স্বীকার করেছে।

তবে সব হামলার দায় ইরানের নয়

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা সত্য ধরে নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক দুটি ঘটনাতেই এখন পর্যন্ত নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

লন্ডনভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক আন্তোনিও জিউস্তোজি বলেন, প্রমাণের ঘাটতি থাকলে রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের মধ্যে সবকিছুর জন্য ইরানকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা যায়। তাঁর মতে, এর অনেকটাই সত্য হলেও সবকিছু যে সত্য, তা নয়।

তার মতে, আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের মতো ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপ তৈরির একটি কৌশলের সঙ্গে মেলে। বার্তাটি হতে পারে—এখন খুব বড় কিছু করা হয়নি, কিন্তু চাইলে আরও বড় ক্ষতি করা সম্ভব।

তবে ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি সন্দিহান। তাঁর যুক্তি, এই মুহূর্তে ইসরাইলকে টেনে আনলে ইরানের কৌশলগত কোনো লাভ নেই। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

ফলে ইরানের অসম যুদ্ধকৌশলের ধরন নিয়ে দীর্ঘদিনের তথ্য থাকলেও চলতি সপ্তাহের দুই ঘটনার সঙ্গে তেহরানের সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এসব অভিযোগের সত্যতা আরও স্পষ্ট হতে পারে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩১
  • ১১:৪৫
  • ৪:০০
  • ৫:৪৩
  • ৬:৫৬
  • ৫:৪৩