
পাহাড়ী টিলা আর নদী হাওরের সমারোহ। চায়ের দেশ আর সবুজের স্বর্গ রাজ্য খ্যাত মৌলভীবাজার। প্রকৃতির অপরুপ রুপ মাধুর্যের কি নেই ওখানে। চোখের প্রতিটি পলকেই প্রশান্তির পরশ। এখানকার উজাড় করা ভূপ্রকৃতির অপরুপ লীলা নিকেতন এ যেন এক ব্যতিক্রমী মায়াবী দৃশ্য। ৯২ টি চা বাগান,মাধকুন্ড ও হামহাম জলপ্রপাত। আর দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি,বাইক্কাবিল ও তার জীববৈচিত্র্য। এজেলার সুন্দর্য বর্ধনের অন্যতম প্রাকৃতিক উপকরণ। সবুজ বন জীববৈচিত্র্য আর অনন্য প্রকৃতি। মনমুগ্ধতার এক অন্যরকম আবেশ।

মনকাড়া চায়ের রাজ্য
এখন বৃষ্টির ফোটায় সজীব সতেজ দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি। কিছুদিন আগেও যেমনটি ছিলোনা। শুস্ক মৌসুমে আধমরা চা গাছগুলি থাকে নির্জীব। বৃষ্টি এলেই পত্রপল্লবে জীবনচক্র ফিরে। তখন কি যে অপরুপ প্রাণবন্ত প্রাণচঞ্চলতা। পাহাড়ী টিলার পরতে পরতে যেন সবুজের ঢেউ খেলা। আকাঁবাকাঁ মেঠো পথে সকাল থেকেই চা কন্যারা কাজে ব্যস্ত। তাদের রপ্তকরা নিজস্ব কায়দা কৌশলে চা পাতা চয়ন ব্যতিক্রমী শৈল্পীকতা। নানা হাড়খাটুনি কঠিন পরিশ্রমী এ মানুষগুলোর জীবন যুদ্ধের গল্প একটু ভিন্ন রকম। তাদের মানবেতর জীবন যাপনের মাঝেও আছে সমৃদ্ধ নিজস্ব সংস্কৃতি। তাদের মনোমুগ্ধকর চা নৃত্য বা কাঠি নৃত্য সমৃদ্ধ করেছে সংস্কৃতিকে। দেশে ১৬৭ চা বাগানের মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার ৭টি উপজেলায় রয়েছে ৯২টি।
জলপ্রপাত
মাধকুন্ড আর হামহাম জলপ্রপাত আকৃষ্ট করে প্রকৃতি প্রেমীদের। দেশের অন্যতম জলপ্রপাত দু’টির অবস্থান যেমন জেলার দু’টি উপজেলায়। তেমনি ব্যতিক্রমী গুণে মুগ্ধ করছে পর্যটকদের। মাধকুন্ড জলপ্রপাত জেলার বড়লেখা উপজেলার কঠিন পাথরের পাহাড় পাথারিয়া পাহাড়ের উপর বহমান গঙ্গামারা ছড়া মাধবকুন্ড জলপ্রপাত হয়ে নীচে পড়ে। ১৬২ ফুট উপর থেকে পড়ে তা মাধবছড়া দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপর থেকে পানি নীচে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট কুন্ড। আর ডান পাশে সৃষ্টি হয়েছে পাথরের গুহা। ওই দৃশ্যগুলোই মাধবকুন্ডের আর্কষণ। এ্যাডভাঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের কাছে হামহাম জলপ্রপাতের গুরুত্ব অন্যরকম। গহীণ অরণ্যের ১৩৫/১৪৭ ফুট উচ্চতার এই অনিন্দ্য সুন্দর এই জলপ্রপাতটি জেলা কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি কুরমা বনবিটে অনেকটা গোপনীয়তায় তার রুপ মাধুর্য জানান দিচ্ছে।
হাকালুকি হাওর
দেশের সবচেয়ে বড় ও এশিয়ার অন্যতম হাওর হাকালুকি। মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ৫টি উপজেলার ১৮,১১৫ হেক্টর আয়তনের ৪০সহ ২৩৮টি বিলের এই বিশাল হাওর বিপন্ন ও বিলুপ্ত প্রজাতির জলজ জীববৈচিত্র্যের আপন নিবাস। মিটাপানির মাছের অন্যতম আধার হাওরটি বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে মনকাড়া রুপ সৌন্দর্যে আপন করে কাছে টানে প্রকৃতি প্রেমীদের।

বৃষ্টিবন লাউছড়া
গহীণ বনে বন্য প্রাণীর হাক ডাক আর অবাধ বিচরণ। জীববৈচিত্র্যের সমারোহের এমন নজরকাড়া অপরুপ প্রকৃতির আধার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার জাতীয় উদ্যান। বৃষ্টি বন বা রেইন ফরেষ্ট “লাউয়াছড়া”। দেশের অন্যতম ও জেলার একমাত্র এই জাতীয় উদ্যানটি দেশি বিদেশী প্রকৃতি প্রেমিদের হ্রদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। উদ্যানের প্রবেশ পথে সারিবদ্ধ গাছ আর আঁকা বাঁকা রেল পথ আকৃষ্ট করে যে কাউকে। কি নেই ওখানে। সবুজ গাছগাছালি,বনজ জঙ্গল আর লতাগুলুমের মধ্যেই নানা জাতের বন্য প্রাণীর আপন নিবাস। সূর্যোদয় কিংবা গোধূলীলগ্নে ওখানকার বাসিন্ধারা জানান দেয় এটাই তাদের আপন ভুবন। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশে অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা।
বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে লাউয়াছড়া অন্যতম। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সুন্দর বনের পরেই লাউয়াছড়া বনের অবস্থান। বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণি,ফলজ,বনজ ও ঔষুধি গাছগাছালি আর লতাগুল্ম। নানা জাতের পাখি আর সবুজ প্রকৃতিতে ভরপুর ‘ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট’ হিসেবে খ্যাত লাউয়াছড়া।
এজেলার চা বাগান,অর্ধশাতাধীক রাবার ও আগর বাগান, কমলা,লেবু ও আনারস বাগান,হাওর,মাধকুন্ড জলপ্রপাত,হামহাম জলপ্রপাত,মাধপুর লেক,আলী আমজদের নবাব বাড়ি,খাসিয়া পুঞ্জি ও পান চাষ, বাইক্কাবিলসহ নানা আর্কষণীয় দর্শণীয় স্থান দেখার পরও পর্যটকরা ছুটেন লাউছড়ায়। জানা যায় ১৯২৫ খিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে ওখানে লাগানো হয় নানা জাতের গাছগাছালি। বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১,২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ খিষ্টাব্দে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
জানা যায় বিশ্ব খ্যাত ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টিডেজ’ ছবির একটি অংশের শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়ায়। কোভিট-১৯ এর পর এবার ঈদে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। রয়েছে তাদের সে রকম প্রস্থুতি। পাঁচ তারকা মানের দুসাই রিসোর্ট ও গ্র্যান্ড সুলতানসহ শতাধিক হোটেল,মোটেল ও রির্সোট পর্যটক বরণে প্রস্তুত। এবিষয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুত্র জানায় পর্যটক বরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা এজেলায় আগত পর্যটকদের নির্বিঘ্ন সেবা দিতে প্রস্তুত।