
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে মানব পাচারের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণ রায়হান চৌধুরীকে (৩০) ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় জিম্মি করে দফায় দফায় ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে একটি দালাল চক্র। তবে টাকা পেয়েও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি; বরং আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করে ভিডিও কলে রায়হানের হাতের আঙুল কেটে নেওয়ার নৃশংস দৃশ্য পরিবারকে দেখানো হয়েছে। গত ৪২ দিন ধরে নিখোঁজ রায়হানের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছে তার পরিবার।
ঘটনার শুরুটা ছিল বিশ্বাসের হাত ধরে। নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের বেতাপুর গ্রামের আবু তাহের চৌধুরীর ছেলে রায়হানকে ইতালিতে নেওয়ার টোপ দেয় তার সহপাঠী শামীম ও সহযোগী রাকিব। পরিচিত মুখ হওয়ায় রায়হানের পরিবারও সরল বিশ্বাসে তাদের হাতে পাসপোর্ট তুলে দেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দফায় ১০ লাখ এবং পরবর্তীতে আরও ২ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে শুরু হয় রায়হানের বিদেশযাত্রা। তবে সৌদি আরব ও মিশর হয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার এক টর্চার সেলে।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। শামীম ও তার সহযোগীরা রায়হানকে জিম্মি করে তার পরিবারের কাছে আরও ১৫ লাখ টাকা দাবি করে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে রায়হানের বাবা ভিটেমাটি ও স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে সেই টাকা পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। তবে পাচারকারীদের টাকার নেশা এতেও কমেনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রায়হানের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হচ্ছে। পৈশাচিকতার চরম সীমায় পৌঁছে পাচারকারীরা ভিডিও কলে রায়হানের একটি আঙুল কেটে নেওয়ার দৃশ্য তার বাবাকে দেখায়। হুমকি দেওয়া হয়, টাকা না দিলে পরবর্তী ধাপে তার হাতের কবজি কেটে ফেলা হবে। এই লোমহর্ষক ঘটনার পর থেকে গত ৪২ দিন ধরে রায়হান সম্পূর্ণ নিখোঁজ।
নিরুপায় হয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রায়হানের বাবা নবীগঞ্জ থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর থেকে আসামিপক্ষ বাদীকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ক্রমাগত হুমকি দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার এই মামলার প্রধান আসামি নজরুল ইসলাম গোপনে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করলে আদালত তার আবেদন নাকচ করে তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
নবীগঞ্জ থানার ওসি মো. মোনায়েম মিয়া জানিয়েছেন, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে মামলাটি বর্তমানে অধিকতর তদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।