বাংলাদেশের জন্য ‘রেড অ্যালার্ট’!

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী বিজেপি সরকার গঠনের পথে এগিয়ে, জয়ের পথে। প্রতিবেশী রাজ্যের এই পালাবদল আমাদের বাংলাদেশের জন্য, বিশেষ করে ভূ-রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

বিজেপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ‘নাগরিকত্ব ইস্যু’। তারা অবশ্যই ​সিএএ কার্যকর করবে, এখানে দুইটা বিষয় বুঝার আছে সিএএ (CAA) ও এনআরসি (NRC)

NRC মানে National Register of Citizens.

​সহজ উদাহরণ যদি বলি, ধরুণ আপনার একটি স্কুল আছে। স্কুলে কারা আসল ছাত্র আর কারা বাইরের লোক, তা বোঝার জন্য আপনি একটি ‘হাজিরা খাতা’ বা রেজিস্টার তৈরি করলেন। যাদের কাছে ভর্তির সঠিক রশিদ বা প্রমাণ আছে, শুধু তাদের নামই ওই খাতায় উঠবে। যাদের প্রমাণ নেই, তাদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে।

​এনআরসি হলো ভারতের নাগরিকদের একটি বিশাল ‘হাজিরা খাতা’।
​এর উদ্দেশ্য হলো কে ভারতের আসল নাগরিক আর কে অন্য দেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, তা খুঁজে বের করা।
​কীভাবে প্রমাণ করতে হয়? ভারতের নাগরিক প্রমাণ করার জন্য একজন মানুষকে দেখাতে হবে যে, তিনি বা তার পূর্বপুরুষরা একটি নির্দিষ্ট সালের আগে (যেমন আসামের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ) ভারতে বসবাস করতেন। এর জন্য পুরনো জমির দলিল, ভোটার লিস্ট বা জন্মের প্রমাণপত্র দেখাতে হয়।

​ফলাফল: ২০১৯ সালে আসামের চূড়ান্ত এনআরসি থেকে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ে, যার মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই রয়েছেন।

CAA মানে Citizenship Amendment Act (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯)

​উদাহারণ: ধরুন, আপনার বাড়ির পাশে তিনটি ক্লাবে খুব গণ্ডগোল চলছে। আপনি ঘোষণা করলেন, “ওই তিন ক্লাবের যে মেম্বাররা মার খেয়ে বা অত্যাচারে টিকতে না পেরে আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, আমি তাদের আমার বাড়ির স্থায়ী সদস্য করে নেব।” কিন্তু এখানে আপনি একটি শর্ত জুড়ে দিলেন “সবাইকে নেব না, শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজনকে নেব।”

​ভারত সরকারের এই আইন অনুযায়ী, ভারতের প্রতিবেশী তিনটি দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে যদি কেউ ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে পালিয়ে আসেন, তবে ভারত সরকার তাদের নাগরিকত্ব দেবে।

​শর্ত ১ (ধর্ম): এই নাগরিকত্ব শুধু ৬টি ধর্মের মানুষ পাবেন হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান। এই তালিকায় মুসলিমদের রাখা হয়নি।
​শর্ত ২ (সময়কাল): ওই ব্যক্তিকে ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করে থাকতে হবে।

সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া সম্প্রদায় (যারা বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু) দীর্ঘদিন ধরে সিএএ-র মাধ্যমে নিঃশর্ত নাগরিকত্ব চেয়ে আসছিল। তবে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR)-এ পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ায় নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৃণমূল একে “এনআরসি-র মহড়া” বলে প্রচার করছে, আর বিজেপি বলছে এটি স্রেফ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া।

আসল গণ্ডগোল বা বিতর্কের জায়গাটি হচ্ছে:
​এনআরসি এবং সিএএ আলাদাভাবে দেখলে মনে হয় দুটি ভিন্ন আইন। কিন্তু বিরোধীদের মতে, এই দুটিকে একসাথে মেলালেই আসল বিপদের চিত্রটি সামনে আসে। বিষয়টিকে তারা একটি “ফাঁদ” হিসেবে দেখেন।
​সহজ কথায় সমীকরণটি হলো (NRC + CAA) = মুসলিমদের জন্য বিপদ!
​কেনো এমন বলা হয়, কয়েকটা ধাপে ক্লিয়ার করি:

​প্রথম ধাপ (সবার জন্য এনআরসি): ধরুন সরকার সারা দেশে এনআরসি চালু করল। তখন হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সবাইকে নিজেদের পুরনো কাগজপত্র দেখাতে হবে। ভারতের মতো বিশাল দেশে, বিশেষ করে গরিব, অশিক্ষিত বা নদীভাঙন এলাকার মানুষের কাছে ৫০-৬০ বছরের পুরনো কাগজ থাকা খুব কঠিন।

​দ্বিতীয় ধাপ (নাম বাদ পড়া): কাগজের অভাবে একজন হিন্দু এবং একজন মুসলিম দুজনের নামই এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়ল। সরকারের খাতায় দুজনেই এখন ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।

​তৃতীয় ধাপ (সিএএ-র ম্যাজিক): এখানেই সিএএ নামক ‘লাইফ জ্যাকেট’ এর প্রবেশ। যে হিন্দু লোকটির নাম বাদ পড়েছিল, সরকার তাকে বলবে, “চিন্তা নেই, সিএএ আইন দিয়ে তোমাকে আমরা ভারতের নাগরিকত্ব দিয়ে দিচ্ছি। তুমি শুধু বলো যে তুমি বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে অত্যাচারিত হয়ে এসেছিলে।” অর্থাৎ হিন্দু লোকটি বেঁচে গেলেন।

​চতুর্থ ধাপ (মুসলিমদের সংকট): কিন্তু যে মুসলিম লোকটির নাম বাদ পড়েছিল, সিএএ আইনে তার কোনো জায়গা নেই। কারণ ওই আইনে মুসলিমদের নাম নেই। ফলে বহু প্রজন্ম ধরে ভারতে বসবাস করা সত্ত্বেও, শুধু পুরনো কাগজের অভাবে সেই মুসলিম লোকটি নিজের দেশেই বিদেশি বা ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে যাবেন। তাকে হয়তো ডিটেনশন ক্যাম্পে (বন্দিশিবিরে) পাঠানো হতে পারে।

​সারসংক্ষেপে যদি বলি, এনআরসি হলো একটি ‘ছাঁকনি’ যার মাধ্যমে নাগরিকদের যাচাই করা হবে। আর সিএএ হলো সেই ছাঁকনিতে আটকে পড়া অমুসলিমদের বাঁচানোর একটি ‘সুরক্ষা কবচ’। যেহেতু এই সুরক্ষা কবচে মুসলিমদের রাখা হয়নি, তাই ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ এনআরসি এবং সিএএ নিয়ে চরম আতঙ্কে ভোগেন। অন্যদিকে, মতুয়া বা অন্যান্য হিন্দু শরণার্থীরা এই সিএএ-র জন্যই দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন, কারণ এটি তাদের বৈধ নাগরিকের মর্যাদা দিচ্ছে।

বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের কি হতে পারে?
​-বিজেপি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানে হিন্দুত্ব এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধের বিষয়টিকে সবসময়ই অগ্রাধিকার দেয়। তারা ক্ষমতায় এলে মুসলিমদের জন্য বেশ কিছু জটিল পরিস্থিতি তৈরি হবে

​নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্ক: সীমান্ত এলাকায় কড়াভাবে এনআরসি বা অনুপ্রবেশকারী যাচাই শুরু হবে। বহু গরিব, নদীভাঙন কবলিত বা অশিক্ষিত মানুষের কাছে পুরনো কাগজ থাকে না। তারা চরম আতঙ্কে পড়বেন।
​তারা কোথায় যাবে? যাদের নাম বাদ পড়বে, তাদের আসলে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশ তাদের গ্রহণ করবে না। ফলে তারা ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে পড়বেন। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হতে পারে অথবা আসামের মতো বড় বড় ‘ডিটেনশন ক্যাম্পে’ (বন্দিশিবিরে) আটকে রাখা হতে পারে।

​ইউসিসি আইন: বিজেপি ক্ষমতায় এলেই ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ চালু করবে। এর মানে হলো বিবাহ, তালাক বা সম্পত্তির ক্ষেত্রে মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন (শরিয়া) আর চলবে না, সবার জন্য এক আইন হবে।

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সামনে আমাদের কিছু কিছু বিষয় ফেস করতে হবে:

​ পুশ-ব্যাক ও সীমান্ত উত্তেজনা: ভারত যদি তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষদের জোর করে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করার চেষ্টা করে, তবে সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফ-এর মধ্যে চরম উত্তেজনা ও গোলাগুলি শুরু হতে পারে। আমাদের ঘাড়ের ওপর আরেকটা ‘রোহিঙ্গা স্টাইলের’ শরণার্থী সংকট চেপে বসার ঝুঁকি তৈরি হবে।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সংকট: পশ্চিমবঙ্গের বেনাপোল, পেট্রাপোলের মতো বন্দর দিয়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়। সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কড়াকড়ি বাড়লে আমাদের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি: বাংলাদেশে এমনিতেই এখন ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট বা ‘ইন্ডিয়া আউট’ হাওয়া বেশ প্রবল। ওপার থেকে উসকানিমূলক কোনো পদক্ষেপ এলে এপারে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামবে। ফলে তিস্তার পানি বণ্টন, ভিসা বা ট্রানজিটের মতো ইস্যুগুলো পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের শঙ্কা: ওপারে ধর্মীয় মেরুকরণ হলে, তার প্রভাব এপারেও পড়তে পারে, যা আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ভারতের প্রথম নেতারা এই NRC ও CAA নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেছেন, “আমি বেঁচে থাকতে বাংলায় এনআরসি বা সিএএ হতে দেব না। এটি মানুষকে ঘরছাড়া করার একটি চক্রান্ত।”

রাহুল গান্ধী এনআরসি-কে ‘গরিবের ওপর ট্যাক্স’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, “নোটবন্দির মতো এবারও সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ভারতীয় পরিচয় প্রমাণ করতে হবে। বড়লোকদের কাগজপত্রের দরকার হবে না, কিন্তু গরিব মানুষ ভিটেমাটি হারাবে।” তিনি একে বিভাজনের রাজনীতি বলে মনে করেন।

আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেছেন, সিএএ এবং এনআরসি হলো ভারতের মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানোর হাতিয়ার। এটি একটি আইনি ও সাংস্কৃতিক গণহত্যার পূর্বপ্রস্তুতি। আমরা সুপ্রিম কোর্টে এবং রাজপথে শেষ বিন্দু পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে লড়ব।

বদরুদ্দিন আজমল (AIUDF): আসামের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “এনআরসি-র নামে গরিব মুসলিমদের কাগজপত্রের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। যারা শত শত বছর ধরে এই মাটির সন্তান, আজ তাদেরই বিদেশি বানানোর চক্রান্ত চলছে।

পশ্চিমবঙ্গের এই সম্ভাব্য নতুন অধ্যায় শুধু ভারতের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে এক বিশাল অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। আমাদের এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৫৩
  • ১১:৫৩
  • ৪:২৫
  • ৬:২৭
  • ৭:৪৮
  • ৫:১৪