
‘আগে ওকে বারবার দেখেছি/লালরঙের শাড়িতে/দালিম ফুলের মতো রাঙা;/আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,/আঁচল তুলেছে মাথায়/দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে।’– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাঙালি নারীর ঈদের আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে আরামদায়ক ও মানসম্মত শাড়ি। যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর নারীর নজর আটকে থাকে শাড়িতেই। আটপৌরে দিনকে রঙিন করতেও সাহায্য করে সেলাইবিহীন এ পোশাক। প্রায় আড়াই-তিন হাজার বছর আগে প্রচলন হওয়া এ পোশাকের আবেদন এখন পর্যন্ত এতটুকু কমেনি। নদীর স্রোতের মতো কত শত পোশাক এলো, সেখানে ফিউশন যুক্ত হলো। পশ্চিমা পোশাকের দিকেও ঝুঁকেছে অনেকে। সব পোশাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের স্বকীয়তা ও অবস্থান ধরে রেখেছে শাড়ি। কিশোরী, তরুণী থেকে শুরু করে প্রবীণার কাছেও এর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এবারের ঈদুল আজহায় দেশীয় পোশাকের ব্র্যান্ডসহ ছোট-বড় প্রায় সব ব্র্যান্ড শাড়ি নিয়ে এসেছে। ঈদ যেহেতু গরমের মধ্যে পড়েছে, শাড়ি তৈরিতে হ্যান্ডলুম, সুতি ও তাঁতের কাপড়ের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। সেসব শাড়িতে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট, রিবন ওয়ার্ক, ডলার ওয়ার্ক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রিন্টের পাশাপাশি জ্যামিতিক ও ফুলেল নকশাকে মূর্ত ও বিমূর্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পোশাকের ব্র্যান্ড সুরঞ্জনার স্বত্বাধিকারী তৃপ্তি নূর জানান, এবারের ঈদের শাড়িতে ফুলের মোটিফ, ফয়েল প্রিন্ট ও জামদানি নকশার প্রাধান্য রয়েছে। ঈদের সকাল-দুপুরে পরার জন্য তাঁত কটন, মসলিন কোটা কটনের শাড়িগুলো উল্লেখযোগ্য।
দেশীদশের বিভিন্ন ডিজাইনারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার অন্য বছরের তুলনায় তাপপ্রবাহ বেশি মনে হচ্ছে। একইসঙ্গে ঝড়-বৃষ্টির আভাসও রয়েছে। তাই ঈদে তাঁতপ্রধান শাড়িগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সুতি, হাফ সিল্ক, সিল্ক ইত্যাদির মধ্যেও আছে সরাসরি তাঁতে বোনা শাড়ি। বিশ্বরঙ, রঙ বাংলাদেশ, কে ক্র্যাফটসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিজাইনারের শাড়ি রয়েছে। সেসব শাড়িতে ভ্যালু যোগ করা হয় বিভিন্ন মাধ্যমে। এর মধ্যে ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রিন্ট, হাতের কাজ, মেশিন এমব্রয়ডারি, কম্পিউটার ওয়ার্ক, এপ্লিক, বাটিক, টাই ডাই, ভেজিটেবল ডাই ইত্যাদি। বিশ্বরঙে পার্টি শাড়ির মধ্যে এবারের ঈদেও মসলিন, বলাকা সিল্কের শাড়িগুলো বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। আবার মসলিন ও বলাকা সিল্কের মিশেলেও কিছু শাড়ি তৈরি করা হয়েছে। কিছু শাড়িতে আলগা নকশি কাঁথার পাড় বসানো হয়েছে। টিস্যু সিল্ক ও হাফ সিল্কের শাড়িতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রিন্ট ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। ব্লকের শাড়ির মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের সেলাই, মিরর ওয়ার্ক, ডলারের কাজ চোখে পড়ার মতো। অনলাইন ব্র্যান্ড সীবনী, সরলা, হরীতকী, খাদি বাই নুভিয়াতে নিজস্ব নকশার শাড়ি করা হয়েছে। সেসব শাড়িতে বিভিন্ন ফুলের মোটিফ, প্রাকৃতিক নকশা, পশুপাখি-প্রাণীর মোটিফ উল্লেখযোগ্য।
নতুন থিমে
লা রিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মন্নুজান নার্গিস বলেন, “ঈদুল আজহায় লা রিভ ‘অনার্ড’ থিম নিয়ে কাজ করেছে। কৃতজ্ঞতা, আত্মত্যাগ ও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে অনুভব করার অনুভূতিকে পোশাকের রং, প্রিন্ট, ফেব্রিক ও কারুকাজে প্রকাশ করতে চেয়েছি এই ঈদে। বাংলাদেশের আবহাওয়া, ঈদের ব্যস্ততা এবং পরিবারের সবার আরামের কথা মাথায় রেখে এ কালেকশনে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ভারসাম্য রাখা হয়েছে।”
একই ধাঁচ ও একই ঢঙে শাড়ি পরতে চান না অনেকেই। কুচি দিয়ে পরিচিত স্টাইলে শাড়ি পরার পাশাপাশি নিজের মতো করে স্টাইল করতে ভালোবাসেন অনেকে। ব্লাউজের বদলে ক্রপটপ পরেন। এর সঙ্গে কুচি দিয়ে শাড়ি পরেন আর আঁচলের অংশটা একেবারে চিকন করে কাঁধে ঝুলিয়ে দেন। অনেকে কোমরে বেল্ট বাঁধেন। এতেও শাড়ির পরিধানরীতিতে ভিন্নতা যোগ হয়। ঈদুল আজহার দাওয়াতে গেলে বিশেষ করে রাতের দিকে ইন্দো-ওয়েস্টার্ন, নিভি, লেহেঙ্গা স্টাইল, বাটারফ্লাই কিংবা ধুতি স্টাইলেও শাড়ি পরতে পারেন।
কোথায় পাবেন, দরদাম
আড়ং, কে ক্র্যাফট, বিশ্বরঙ, রঙ বাংলাদেশ, নিপুণ, লা রিভ, সুরঞ্জনা, সাতকাহনসহ ছোট-বড় সব ব্র্যান্ড থেকে ঈদের শাড়ি কিনতে পারবেন। সুরঞ্জনা থেকে স্ক্রিন প্রিন্টের কটন শাড়ি দুই হাজার ৬৫০ টাকা, ফয়েল প্রিন্টের তাঁত কটন শাড়ি তিন হাজার ৭০০ টাকা, ফয়েল প্রিন্টের মসলিন কোটা কটনের শাড়ি চার হাজার টাকায় কেনা যাবে। বিশ্বরঙ, লা রিভসহ অন্যান্য ব্র্যান্ড থেকে শাড়ি কেনা যাবে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে।