
‘৩৫ তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’র দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত হলো। বৃষ্টি উপেক্ষা করে বইমেলার দ্বিতীয় দিনে মানুষের উপচেপড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে। একে একে সম্পন্ন হয়েছে মেলার সকল কর্মসূচি। বিশেষ করে শিশু-কিশোর-কিশোরীদের প্রতিযোগিতা, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, স্বরচিত কবিতা পাঠ (কাব্যের কোলাহল) ও আবৃত্তি আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে।
দিনের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল— বইয়ের স্টল উদ্বোধন; শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মহাশ্বেতা দেবী ও তপন রায় চৌধুরী জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি; নতুন বই নিয়ে আলোচনা; ‘বাউল: বাংলার সাংস্কৃতিক বাহক ও বর্তমান সংকট’ শীর্ষক আলোচনা; মহান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সেমিনার; ‘কলম ও কৌতুক’ শীর্ষক আলোচনা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটক মঞ্চায়ন; পল্লীকবি জসিমউদদীনের গান নিয়ে আলেখ্য নৃত্য ‘সুজন মাঝি’; ‘প্রবাস জীবন— বাঙালিকে দিয়েছে বাণিজ্যিকতা, কেড়ে নিয়েছে আন্তরিকতা’ শীর্ষক বিতর্ক অনুষ্ঠান আর শিল্পী অদিতি মহসিনের একক সঙ্গীত অনুষ্ঠান ‘সীমার মাঝে অসীম’।

তবে দিনভর বৃষ্টির কারণে বইয়ের স্টলে তেমন ভিড় পরিলক্ষিত না হলেও মূলমঞ্চের অনুষ্ঠানগুলো দেখতে ভিড় ছিল দর্শক-শ্রোতাদের। আর স্টলগুলোতে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন ছিলেন বইপ্রেমীদের মধ্যমণি। লেখকের বই ক্রয়ের পাশাপাশি তাঁর অটোগ্রাফ নিতেও দেখা যায় অনেককে। তবে বই বিক্রি হয়েছে কম।
মেলার দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন পর্বে বইমেলার উদ্বোধক বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন; আমন্ত্রিত অতিথি সাংবাদিক রোকেয়া হায়দার ও তৌফিক ইমরোজ খালিদী; বিজ্ঞানী ও লেখক দীপেন ভট্টাচার্য এবং জনপ্রিয় সাহিত্যিক সাদাত হোসাইনসহ লেখক ফেরদৌস সাজেদীন, মোস্তফা সারোয়ার, আশরাফ কায়সার, আশিক মুস্তাফা, সৌরভ শিকদার, আবদুর নূর, সুবোধ সরকার, নসরাত শাহ আজাদ, শামীম রেজা, রাজিয়া নাজমী, কৌশিক সেন, অভিনেত্রী শিরীন বকুল ও মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ অংশ নেন। এদিন প্রবাসী লেখকদের মধ্যে আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু ও সাঈদ তারেকের উপস্থিতি এবং তাঁদের বই ক্রয়ের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।

উল্লেখ্য, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত চারদিনের ‘৩৫ তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’ শুক্রবার (২২ মে) থেকে শুরু হয়েছে। শনিবার (২৩ মে) ছিল মেলার দ্বিতীয় দিন। মেলার কর্মকাণ্ড সফল করতে মূল কমিটি ও বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠনের পাশাপাশি মেলাস্থল জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের মূল মঞ্চের নামকরণ করা হয়েছে ‘শামসুদ্দীন আবুল কালাম মঞ্চ, মহাশ্বেতা দেবী মঞ্চ, কাজী নজরুল মঞ্চ ও তপন রায় চৌধুরী মঞ্চ’ এবং উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের নামকরণ করা হয়েছে ‘লালন মঞ্চ’।
সাদাত হোসাইনের মূল্যায়ন : উদ্বোধনী দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন রোববার (২৪ মে) তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন: “‘৩৫ তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মঞ্চে তখন কিংবদন্তি অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান; বিশ্ববিখ্যাত কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. رওনক জাহান; চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর; প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন; ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের প্রথম নারী প্রধান রোকেয়া হায়দার; কবি সুবোধ সরকারসহ অসংখ্য গুণী মানুষ।
এর আগেরবার নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ লেখক হিসেবে এর ৩৪ তম আসর উদ্বোধন করেছিলাম আমি। সেদিন আমি জানতাম যে মঞ্চে আমাকে বক্তব্য রাখতে হবে। কিন্তু এবার জানতাম না। আগেভাগে কিছু বলাও হয়নি। তাছাড়া সময় সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ এক বা দুজন মানুষের হয়তো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকবে। স্বভাবতই সবচেয়ে কনিষ্ঠ হিসেবে তাতে আমার নাম থাকার কথা নয়। কিন্তু আমাকে হতচকিত করে দিয়ে ড. রওনক জাহানের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পরই মাইকে ঘোষণা করা হলো আমার নাম! এরপর উপস্থিত অতিথিদের মধ্য থেকে আর মাত্র দুজন কথা বলবেন— অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান ও লেখক ইমদাদুল হক মিলন।
এত এত অতিথিদের ভিড়ে বক্তব্যের তালিকায় হঠাৎই নিজের নাম শুনে ভীষণ নার্ভাস হয়ে গেলাম আমি। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না, গলা কাঁপছিল। এতটা অপ্রস্তুত ও নার্ভাস বোধহয় কখনো লাগেনি। তারপরও কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কী কী যেন বললাম। সেসব শুনে হলভর্তি দর্শকেরা তুমুল করতালিও দিলেন। দু মিনিটের এই বক্তব্য নিয়ে অনুষ্ঠান শেষেও দারুণ সব প্রতিক্রিয়া শুনে মনে হলো, জীবনের এইসব অভাবিত প্রাপ্তি আসলে মন্দ নয়।”
একই দিন এর আগের পোস্টে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন তাঁর ফেসবুক পেজে লেখেন: “প্রচণ্ড বৃষ্টি, ঠান্ডা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করেও নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় যেসকল পাঠক গতকাল উপস্থিত হয়েছিলেন, বই কিনেছিলেন— তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। ঠান্ডা সবসময়ই আমার জন্য ভীতিকর। গতবার এসেই ভয়াবহ জ্বরে পড়েছিলাম। এবার এখন পর্যন্ত তাই আগাম সতর্কতায় জবুথবু হয়ে আছি। যাদের কাছে বইমেলার মুক্তধারা স্টল থেকে বই সংগ্রহের বা মঞ্চে আমার আলোচনার ছবি ও ভালো ভিডিও আছে, তাঁদের দয়া করে ইনবক্সে পাঠানোর অনুরোধ করছি। দেখা হবে আজ ও আগামীকালও। এরপর দেখা হবে ভার্জিনিয়ায়— ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসবে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ২৯-৩০ মে।”

মাহমুদ রেজা চৌধুরীর অপারগতা: নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা শুরুর প্রাক্কালে লেখক এবং সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক মাহমুদ রেজা চৌধুরী মেলার আয়োজকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন: “আমি নিজেকে কখনো লেখক বলে মনে করি না। সামান্য সমাজ বা রাজনীতি বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করি মাত্র। বিশ্লেষণ যে কেউ করতে পারেন; এতে কোনো বড় বিদ্যাবুদ্ধি দরকার হয় না। লেখক ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁদের মনে করি যাঁরা গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও সাহিত্যের নানান শাখা নিয়ে লেখালেখি করেন। আমি এর ধারকাছে নাই। অতএব আমাকে লেখক বলার কোনো প্রয়োজন নাই; বাড়তি কিছু না বললে খুশি হব। আমি বইমেলাতে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই কারণেই যে, এটা সাধারণত যাঁরা উল্লেখিত বিষয়ে লেখালেখি করেন তাঁদের একটা মিলনমেলা— যাঁদের এইসব নিয়ে বই বাজারে আছে এবং যাঁদের বই আপনাদের মেলার স্টলে পাওয়া যাবে। এটা মূলত তাঁদের মেলা। এখানে আমাকে আমন্ত্রণ করেছেন, ধন্যবাদ; কিন্তু আমি উপস্থিত থাকতে পারছি না। কোনো মঞ্চে এসে কোন বক্তব্য দিতে পারছি না, কারণ এই মেলাতে আমার কোনো বই আপনাদের কোন স্টলে নাই। এ অবস্থায় কোথায় আমার বই পাওয়া যাবে এটা আপনাদেরকে বলা অথবা জানানো অনেকটা নিজের আত্মপ্রচার হয়ে যায়। বই এখানে পাওয়া গেলে একটা কথা থাকতে পারত হয়তো। তাই আমি অপারগ এবং দুঃখিত আপনাদের অনুষ্ঠানে না যাবার জন্য। আমাকে মাফ করবেন।
শ্রদ্ধান্তে— মাহমুদ রেজা চৌধুরী মে ২০, ২০২৬”

একজন প্রবীণ সম্পাদকের অভিযোগ: নিউইয়র্কের একজন প্রবীণ সম্পাদক অনেকটা অভিযোগের সুরে এই প্রতিবেদককে বললেন: “নিউইয়র্কে ৩৫ বছর ধরে বাংলা বইমেলা হচ্ছে। মেলাটিকে এখন আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই মেলার প্রচার ও প্রসারে নিউইয়র্কের বাংলা মিডিয়াগুলোর অবদান স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ৩৫ বছরেও বাংলা মিডিয়া আর সম্পাদকরা সম্মানিত হননি; এটা খুবই দুঃখজনক।” তিনি আরও বলেন: “আমার মনে হয়— ৩৫ বছরেও নিউইয়র্ক তথা বাংলাদেশি কমিউনিটি এখনো স্বাবলম্বী হয়নি। তা না হলে ঢাকা-কলকাতা থেকে কেন এত অতিথি আনতে হবে? উত্তর আমেরিকায় কি লেখক তৈরি হয়নি?” প্রসঙ্গত তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন: “যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ কেন অন্য একটি দেশের দলের শাখা হবে?”
প্রবীণ প্রবাসী নাসির খান পল: বইমেলা সম্পর্কে প্রবীণ প্রবাসী নাসির খান পল তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন: “এরা বইয়ের ‘ব’ পড়ে না, কিন্তু সবার আগে সেজেগুজে মাথায় বেলি ফুলের মালা দিয়ে শুধু সেলফি তোলার জন্য আসে। সব স্টলে গিয়ে একটি বই নিয়ে ছবি তোলে লেখকের সাথে; এদের সংখ্যাই বেশি।”
জুয়েল সাদাত: ফ্লোরিডা প্রবাসী সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট জুয়েল সাদাত লিখেছেন: “দাদা যেদিন ইনভাইট করবে সুন্দর করে, হিসাবে নিয়ে— সেই বছর যাব, ৩৫ হোক আর ৪০ হোক।”

বইমেলায় আগত অপর এক সচেতন প্রবাসী এই প্রতিবেদককে সরাসরি অভিযোগ আকারেই বললেন: “বিশ্বজিৎ সাহা নিউইয়র্কের বইমেলার অগ্রদূত; এটা সবাই জানেন। কিন্তু কেন বারবার তাঁকেই বইমেলার সদস্যসচিব হতে হবে?”
এদিকে এবারের আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা নিয়ে নিউইয়র্ক প্রবাসী কবি ফকির ইলিয়াসের নিজের ফেসবুকে লেখা: “নিউইয়র্কের কিছু লেখক দেখলাম কান্দাকাটি করতেছেন, গুপ্তধারার বইমেলায় নাকি তাদেরকে স্টল/বই রাখার জায়গা দেয় নাই! দুই পক্ষই লালবদর। তারপরও…” মন্তব্যটি নিয়ে কমিউনিটির অনেকের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।