বেতনের দাবিতে ৪টি চা বাগানে ধর্মঘট: ঈদে হাহাকার শ্রমিক পরিবারে

চরম অর্থ সংকটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী দেউন্দি টি কোম্পানি লিমিটেডের চার চা বাগান। এর জেরে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি, স্টাফদের বেতন-ভাতা এবং আসন্ন ঈদুল আজহার বোনাসসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পরিশোধ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বকেয়া মজুরির দাবিতে কোম্পানিটির অধীনস্থ হবিগঞ্জের তিন ও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের একটিসহ চারটি চা বাগানের শ্রমিকরা একযোগে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। আজ সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকে দেউন্দি, লালচান, মৃতিঙ্গা (মিরতিংগা) ও নোয়াপাড়া চা বাগানের প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ রেখেছেন।

ঈদের আগে বন্ধ ‘তলব’, বিপাকে মুসলিম শ্রমিকরা

আন্দোলনরত চা শ্রমিকরা জানান, গত ২১ মে (বৃহস্পতিবার) সাপ্তাহিক মজুরি বা ‘তলব’ পরিশোধ করার কথা থাকলেও দেউন্ডি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আকস্মিকভাবে তা বন্ধ করে দেয়। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে দৈনিক মাত্র ১৮৭.৪৩ টাকা মজুরিতে এমনিতেই চা শ্রমিকদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তার ওপর সারা সপ্তাহ হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে মজুরি না পেয়ে শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

বিশেষ করে মৃতিঙ্গা চা বাগানসহ চার বাগানে বসবাসরত শত শত মুসলিম চা শ্রমিক পরিবার আসন্ন ঈদুল আজহার ঠিক আগে এই তলব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েছেন।

বাগান কর্তৃপক্ষের নোটিশ ও হাফ পেমেন্টের প্রস্তাব

মৃতিঙ্গা চা বাগানের ব্যবস্থাপক ও উপ-ব্যবস্থাপকের দেওয়া এক লিখিত বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণ প্রদান না করার কারণে ২১ মে থেকে সাপ্তাহিক মজুরি দেওয়া বন্ধ থাকছে। ব্যাংক লোনের ওপরই পরবর্তী তলব নির্ভর করছে। একই সাথে যতদিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের তলব দিতে পারবে না, ততদিন পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘স্ববেতন’ বা মজুরির দায়ভার বাগান কর্তৃপক্ষ বহন করবে না। তবে ম্যানেজমেন্ট ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে মৃতিঙ্গা চা বাগানের ডেপুটি ম্যানেজার রেজাউল হায়াত খান (ইমন) বলেন, “এই বাগানে শ্রমিকদের আগের কোনো বকেয়া নেই। ব্যাংক থেকে গত বৃহস্পতিবার টাকা উত্তোলন করা যায়নি বলে এই সমস্যা হয়েছে। আমরা এই সপ্তাহে শ্রমিকদের ‘হাফ পেমেন্ট’ (অর্ধেক মজুরি) দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা সেটি গ্রহণ না করে আন্দোলন শুরু করেছে।”

রাজপথে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ

আজ সোমবার সকাল থেকে পূর্বঘোষিত আল্টিমেটাম অনুযায়ী মৃতিঙ্গা চা বাগানের ফ্যাক্টরির সামনে শ্রমিকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি মন্টু অলমিকের সভাপতিত্বে কর্মবিরতি ও সমাবেশে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-ধলই ভ্যালির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য ধনা বাউরি, চা-ছাত্র যুব পরিষদের মনু-ধলই ভ্যালির যুগ্ম আহ্বায়ক মানিক প্রসাদ পাল, সিরাজুল ইসলাম জব্বার, রামনারায়ণ কৈরী, ইমরান নাজির এবং মহিলা দফার সর্দার নিয়তি রাজগৌড় প্রমুখ।

ইউপি সদস্য ধনা বাউরী বলেন, “ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে পূর্ণ মজুরি প্রদান না করে কোম্পানি শ্রমিকদের সাথে অন্যায় করছে। বকেয়া মজুরির কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তাও তারা দিচ্ছে না। ফলে সাধারণ শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রেখেছেন।” অন্যদিকে হবিগঞ্জের নোয়াপাড়া চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি কমেট নায়েক জানান, উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের সাথে শ্রমিক প্রতিনিধিদের বৈঠক চলছে।

চা শ্রমিক সংঘের তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

দেউন্দি কোম্পানির ৪টি চা বাগানের এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন চা শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শ্যামল অলমিক ও সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ণ হাজরা।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “শ্রমিকদের শুধু বর্তমান মজুরিই বন্ধ করা হয়নি, বরং ২০২২ সালের বকেয়া এরিয়ারের ৪ হাজার টাকাও এখনো পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ তহবিলের (পিএফ) চাঁদা নিয়মিত প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা করা হয় না এবং বাগানের হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাও মিলছে না।” অবিলম্বে দেউন্দি টি কোম্পানির ৪টি চা বাগানে সাপ্তাহিক মজুরি ও বকেয়া এরিয়ার পরিশোধসহ সব সমস্যার যৌক্তিক সমাধানে সরকার ও চা বাগান কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান তারা।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৪২
  • ১১:৫৩
  • ৪:২৮
  • ৬:৩৬
  • ৮:০০
  • ৫:০৬