প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন। তাঁর এ সফরকে ঘিরে উভয় দেশের মধ্যে চলছে প্রস্তুতি। নয়াদিল্লি ও ঢাকার সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নয়াদিল্লি সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সফর সম্পন্ন হলে এটি হবে তাঁর প্রথম ভারত সফর। এটি দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্য, সংযোগ (কানেকটিভিটি), জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে এই বৈঠকে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
দুই দিনের এই সফরটিকে একটি দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচি হিসেবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সফরের সময়সূচির বিস্তারিত বিষয় চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে আলোচনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। আগামী সেপ্টেম্বরে রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্যও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌল্লা সুজন মাহমুদ সমকালকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সফরটি কেন তাৎপর্যপূর্ণ
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যখন উভয় পক্ষই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। এই সফরের মাধ্যমেই সব অমীমাংসিত বিরোধের সমাধান হয়ে যাবে—এমনটা আশা করা হচ্ছে না। শেখ হাসিনা ইস্যু, পানি বণ্টন এবং কিছু বাণিজ্য ও সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন হবে।
তবে নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যে সরাসরি বৈঠক এই মতপার্থক্যগুলো দূর করার জন্য একটি রাজনৈতিক পথ তৈরি করতে পারে। এই সফর তারেক রহমানকে তাঁর সরকারের অবস্থান সরাসরি ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরতে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদির জন্য এটি হবে নতুন বাংলাদেশ সরকারের কাছে নয়াদিল্লির প্রত্যাশাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার একটি সুযোগ। সফরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব ঠিক থাকলে, আগামী সপ্তাহে তারেক রহমানের দিল্লি সফর হতে যাচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা।
এই মুহূর্তে মূল লক্ষ্য হলো- দুই পক্ষকে পুনরায় আলোচনায় ফিরিয়ে আনা। কঠিন সমস্যাগুলো যেন সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গ্রাস করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
নরেন্দ্র মোদি-তারেক রহমানের প্রথম বৈঠক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে দুই দেশ
বাংলাদেশ ও ভারত উভয় পক্ষই নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠকটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। তারেক রহমানের ক্ষমতায় ফিরে আসা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে এবং ঢাকাকে নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্মূল্যায়ন করতেও বাধ্য করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে মারাত্মক টানাপোড়েন তৈরি হয়। তখন থেকেই শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
তবে বিএনপি সরকার জানিয়েছে, তারা ভারতের সঙ্গে কাজ করতে চায়। সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার কিছু লক্ষণও দেখা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলে নয়াদিল্লি সফর করেন। তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক পরিবেশ উন্নত করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
শেখ হাসিনা প্রত্যর্পণ অনুরোধ- বড় ইস্যু
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। তারপর থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লির কাছে তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি জানায়। ভারত জানিয়েছে, যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অনুরোধটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই মাসের শুরুর দিকে বিতর্কটি আবারও সামনে আসে যখন শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন। ঢাকা এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ভারতের মাটি ব্যবহার করা উচিত নয়। নয়াদিল্লি অবশ্য এই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।
সূত্র মতে, তারেক রহমান ওে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকেও এই প্রত্যর্পণের বিষয়টি উঠে এসেছে। বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ব্যাহত না করে এই বিতর্ক নিয়ে আলোচনার একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে উভয় সরকারকেই।
পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত সমস্যা
উভয় দেশের মধ্যে চলমান সমস্যার সমাধান করার মতো দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। আসন্ন আলোচনা মূলত দুই দেশের বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সংযোগের (কানেকটিভিটি) মতো নানা বিষয়ের ওপর আলোকপাত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দীর্ঘ স্থল সীমান্ত এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও পরিবহন যোগাযোগ রয়েছে। তাই রাজনৈতিক সম্পর্কের যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এই ক্ষেত্রগুলোতে খুব দ্রুতই দৃশ্যমান হবে।
আরেকটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হতে পারে পানি বণ্টন। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। এই সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তিটির নবায়নের বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকা বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইস্যুতে ভারতের কাছ থেকে আরও বড় ধরনের সহযোগিতাও কামনা করেছে। নয়াদিল্লির জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল অভিন্ন সীমান্তের কারণেই নয়, বরং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে এর সংযোগের কারণেও।
আমারসিলেট/হা



