ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে ছয়জনের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে এবং একজনের মরদেহ সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্ত দিয়ে দেশে আসার কথা রয়েছে। শনিবার দুপুরের মধ্যে মরদেহগুলো দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
নিহত আরেক বাংলাদেশি রেবতী সরকারের মরদেহ দেশে আনা হচ্ছে না। পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলকাতাতেই তার সৎকার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ উপহাইকমিশন এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বেনাপোল দিয়ে যে পাঁচজনের মরদেহ আসবে, তারা হলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, তাদের তিন বছর বয়সী ছেলে স্বর্ণাশীষ দত্ত, আফসানার বাবা মো. আকরাম আলী এবং ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের ব্যবসায়ী বাবু আহমেদ। সাতক্ষীরার এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর মরদেহ ভোমরা সীমান্ত দিয়ে দেশে আনার কথা রয়েছে।
শুক্রবার কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন জানিয়েছিল, মরদেহ দেশে ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করার কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলছে। নিহতদের ময়নাতদন্তও এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
শনিবার সকালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো কফিনে করে বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে নিহতদের স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। মরদেহ দেশে পাঠানোর আগে শনাক্তকরণসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বেনাপোল ইমিগ্রেশন ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মরদেহ গ্রহণ ও দেশে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।
নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চারজন। তারা হলেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, তাদের একমাত্র ছেলে স্বর্ণাশীষ এবং আফসানার বাবা মো. আকরাম আলী।
দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকতা করতেন। তিনি দৈনিক আজকের পত্রিকা ও একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, আফসানা শারমীনের চিকিৎসার জন্য তারা কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানেই ‘শিখা ইন’ হোটেলে অবস্থানকালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
দেবাশীষ ও তার তিন বছর বয়সী ছেলে স্বর্ণাশীষকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার। অন্যদিকে আফসানা শারমীন ও তার বাবা আকরাম আলীকে দাফন করা হবে বলে জানা গেছে।
নিহত অন্য বাংলাদেশিদের মধ্যে ছিলেন সাভারের আমিনবাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী বাবু আহমেদ এবং সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের এস এম আলিমুজ্জামান ও রেবতী সরকার। তাদের মধ্যে আলিমুজ্জামান ও রেবতী চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কলকাতায় গিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
রেবতী সরকারের পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার মরদেহ কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশানে সৎকার করা হবে। পরিবারের সদস্যদের একটি অংশ কলকাতায় অবস্থান করছেন এবং তারাই সৎকারের ব্যবস্থা করছেন।
১৯ আগস্ট গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ভবনে থাকা ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লাগে। ওই ঘটনায় মোট নয়জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক। ভবনটি ছিল পাঁচতলা এবং সেখানে একাধিক হোটেল, আবাসিক ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছিল।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, আগুন ও ঘন ধোঁয়ার কারণে ভবনের ভেতরে থাকা লোকজন আটকা পড়েন। নিহতদের অনেকেই ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। প্রায় ৮০ জনকে ওই ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানার বিষয়গুলো তদন্ত করছে। ‘শিখা ইন’-এর ইজারাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফেরানোর মধ্য দিয়ে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে। তবে কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও ঢাকার পরিবারগুলোর জন্য কলকাতার ওই রাতের ঘটনা হয়ে থাকল এক গভীর শোকের স্মৃতি।



