গ্যাস সংকটে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করে সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করেছেন। শুক্রবার সকালে সিলেট নগরের শিবগঞ্জ এলাকার সুরমা অটো কেয়ার সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়েন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রী ও যানবাহনের চালকেরা।
বিক্ষোভকারী শ্রমিকেরা বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় তাঁদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন গাড়ি চালিয়ে বা সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই তাঁদের সংসার চলে। কিন্তু হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। গ্যাস সংকটের কারণে তাঁদের জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়লেও শ্রমিকদের সঙ্গে যথাযথভাবে আলোচনা করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
শ্রমিকদের ভাষ্য, সিএনজি না থাকায় অনেক চালক গাড়ি নিয়ে বের হতে পারছেন না। আবার কেউ কেউ গাড়ি নিয়ে বের হলেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে চালকদের আয় কমছে, অন্যদিকে যাত্রীদেরও অতিরিক্ত সময় ও ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ অনাকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায়।
গত বুধবার দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে জালালাবাদ গ্যাস জানায়, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের বিতরণ এলাকায় স্বল্প চাপ বিরাজ করছে। এ কারণে গ্রাহকদের গ্যাসের ব্যবহার ৫০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়। অন্যথায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এরপর গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় যানবাহনে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হতে থাকে।
গ্যাস সংকটের মধ্যে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ অনার্স অ্যাসোসিয়েশন, সিলেট বিভাগের পক্ষ থেকে সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, জাতীয়ভাবে গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি অ্যাসোসিয়েশন, সিলেট বিভাগ এবং জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে—১৩ আগস্ট সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরবর্তী পাঁচ দিন প্রতিদিন সকাল আটটা পর্যন্ত সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকবে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোররাত ও সকাল পর্যন্ত সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। ফলে রাতের পর সকাল পর্যন্ত সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শ্রমিকেরা বলছেন, পাঁচ দিনের এ সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করবে। অনেক চালক দৈনিক আয় করে সংসার চালান। তাঁদের কাছে এক দিন গাড়ি বন্ধ থাকার অর্থই হলো এক দিনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। টানা কয়েক দিন গাড়ি চালাতে না পারলে পরিবার নিয়ে তাঁদের বিপাকে পড়তে হবে।
ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল আটটার পর থেকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ দেওয়ার কথা। কিন্তু শুক্রবার সকাল আটটার পরও অনেক স্টেশনে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়নি।
তাঁদের ভাষ্য, গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলেও চাপ অত্যন্ত কম। ফলে চাহিদা অনুযায়ী যানবাহনে গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। এতে স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে এবং চালকদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে।
বিষয়টি জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকেরা বলছেন, গ্যাস সংকটের বিষয়টি তাঁরা বুঝতে পারছেন। জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে সাময়িকভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল।
তাঁদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষ ও পরিবহন শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় হঠাৎ করেই ভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রী, রোগী বহনকারী যানবাহন, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ সমস্যায় পড়ছেন।
মালিকদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হলে আগেই গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জনগণকে জানানো উচিত ছিল। এতে মানুষ বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেতেন।
জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে নগরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন খোলা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মালিক সমিতির দায়িত্বশীলরা। তবে খোলা স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে সকাল থেকে এসব স্টেশনের সামনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও চালকদের মধ্যে গ্যাস নেওয়া নিয়ে অপেক্ষা ও বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকেরা বলেন, গ্যাস সংকট তাঁদের তৈরি করা নয়। কিন্তু সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তাঁদের ওপর। গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে মালিকদের পাশাপাশি চালক ও শ্রমিকদের আয় বন্ধ হয়ে যায়।
তাঁরা বলেন, ‘গাড়ি চালিয়ে প্রতিদিন যে টাকা আয় করি, তা দিয়েই সংসার চলে। কয়েক দিন গাড়ি বন্ধ থাকলে আমাদের পরিবার না খেয়ে থাকার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে।’
শ্রমিকদের দাবি, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করার দাবি জানান তাঁরা।
শুক্রবার সকালে শ্রমিকেরা সুরমা অটো কেয়ার পাম্পের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে সিলেট-তামাবিল সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে সড়কে অবস্থান নেওয়ায় দুই দিকে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, খাদিমনগর, তামাবিলসহ বিভিন্ন এলাকার দিকে চলাচলকারী যানবাহনগুলো আটকা পড়ে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গ্যাস সংকটের কারণে একদিকে যেমন সিএনজি স্টেশনগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা। একই সঙ্গে সিএনজির ওপর নির্ভরশীল নগর ও আন্তঃউপজেলা পরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু সিএনজি স্টেশন বা পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নগরের গণপরিবহন, ছোট ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি গ্যাস বিতরণের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ও সমন্বিত পরিকল্পনা করার দাবি জানিয়েছেন সিএনজি শ্রমিক ও মালিকেরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিবহন খাতে তৈরি হওয়া অচলাবস্থাও দ্রুত কেটে যাবে।



