আমেরিকায় মুসলিম কমিউনিটির চালিকাশক্তি ইকনা ও মুনা

আমেরিকায় আসার পর থেকেই ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা (ICNA) ও মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকা (MUNA)—এই দুটি সংগঠনের নাম বিভিন্ন সময় শুনে আসছি। প্রায় তিন-চার দশক আগে ইকনা নামটি বেশি পরিচিত ছিল। সে সময় অনেকে এটিকে পাকিস্তানভিত্তিক জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট একটি সামাজিক-ধর্মীয় নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখতেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে গত দুই দশকে মুনা নামের সংগঠনটি বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির মধ্যে আরও দৃশ্যমান ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংগঠন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, যদিও বিভিন্ন পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী ঘরানার অনেকেই নেতৃত্বে যুক্ত থাকেন, তবুও তারা প্রকাশ্যে কোনো দলীয় পরিচয় ব্যবহার করেন না। বাংলাদেশ থেকে জামাতের রাজনীতি করে আসা লোকজনই মুনার সাথে জড়িত। তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা ব্যাপক। প্রবাসী নারীদের মধ্যে তাদের কার্যক্রম খুবই শক্তিশালী।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী দুটি সংগঠন হলো ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা এবং মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকা। সংগঠন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, ধর্মীয় শিক্ষা, দাওয়াহ কার্যক্রম, সামাজিক সেবা এবং কমিউনিটি সংগঠনের মাধ্যমে এই দুটি নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তর আমেরিকার মুসলিম জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথমদিকে এটি মূলত দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের একটি ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে এটি একটি বৃহৎ জাতীয় সংগঠনে পরিণত হয়, যার লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়নকে শক্তিশালী করা। এছাড়া আরব আমেরিকানদের সংগঠন মুসলিম আমেরিকান সোসাইটিও (MAS) একটি শক্তিশালী সংগঠন।

১৯৭০-এর দশক থেকে ইকনা তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করে একটি সংগঠিত কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়। পরবর্তীতে সংগঠনের বিভিন্ন শাখা গড়ে ওঠে, যেমন—ইকনা রিলিফ (মানবিক সহায়তা), হোয়াইইসলাম (দাওয়াহ কার্যক্রম), ইয়ং মুসলিমস (তরুণদের সংগঠন) এবং সোশ্যাল জাস্টিস কাউন্সিল। বর্তমানে ইকনা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বহু অঙ্গরাজ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এর অন্যতম প্রধান ইভেন্ট হলো তাদের বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন, যেখানে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকেন।

সংগঠন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ইকনা মূলত চারটি প্রধান ক্ষেত্রে কাজ করে—ধর্মীয় শিক্ষা, দাওয়াহ, সামাজিক সেবা এবং মানবিক সহায়তা। তারা বিভিন্ন কমিউনিটি প্রোগ্রাম, ফুড ব্যাংক, দুর্যোগকালীন সহায়তা, শরণার্থী সহায়তা এবং তরুণদের নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে। পাশাপাশি আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সামাজিক ন্যায়ের বিষয়েও সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

ইসলামিক সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকাও (ISNA) যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আমেরিকাজুড়ে মুসলিম ঐক্য, নেতৃত্ব বিকাশ, শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজনের মাধ্যমে মুসলিম কমিউনিটির সেবা ও উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ সংগঠনের সাথে জড়িত মুসলিম আমেরিকানরা এবং সব রাজ্যেই তাদের তৎপরতা দিনদিন বাড়ছে।

একসময় যারা ইকনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকা গড়ে ওঠে বলে অনেকের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। মুনা মূলত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটিতে বেশি সক্রিয় একটি দাওয়াহ ও ইসলামিক শিক্ষা-কেন্দ্রিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত।

মুনা স্থানীয় মসজিদভিত্তিক ইউনিট ও ছোট ছোট সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। এর কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত দারস, ইসলামিক শিক্ষা, পরিবারভিত্তিক প্রোগ্রাম এবং তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম। সংগঠনটি কমিউনিটি পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সংহতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়।

ইকনার সবচেয়ে বড় বার্ষিক আয়োজন হলো ইকনা–মাস অ্যানুয়াল কনভেনশন, যা উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সম্মেলন হিসেবে পরিচিত। ইকনা মুসলিম আমেরিকান সোসাইটির সাথে মিলে এ সম্মেলন প্রতিবছর করে থাকে। এতে ধর্মীয় বক্তৃতা, কর্মশালা, সামাজিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং যুব কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্মেলনে প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০-এরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ দেখা গেছে।

অন্যদিকে মুনা প্রতি বছর ফিলাডেলফিয়া কনভেনশন সেন্টারে তাদের বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করে থাকে। সেখানে প্রায় বিশ হাজারের কাছাকাছি অংশগ্রহণকারী উপস্থিত হন বলে জানা যায়। উভয় সংগঠনই নারী, যুবক এবং পরিবারভিত্তিক অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

উপমহাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চার উত্থানের সাথে প্রবাসে এ দুই সংগঠনের প্রসারও ঘটেছে। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অনেক অভিবাসীই এসব সংগঠনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বেশ আগে থেকেই বলে আসছেন এবং তাদের গোপন রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়েও প্রায়ই কথা উঠে থাকে। যদিও মুনার সংগঠকরা নিজেদের জামাতে ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্টতার কথা এড়িয়ে যান। বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই দূর দেশে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের সংগঠন হিসেবে মুনা বা ইকনার সাথে জড়িত হন। জামাতে ইসলামের সকল প্রবাসী সদস্যরাই মুনার নিয়মিত চাঁদাদাতা এবং তাদের জোরালো সাংগঠনিক তহবিল রয়েছে।

বাল্টিমোরে আজ ২৪ মে ইকনা সম্মেলনে পরিবার প্রতি ২৭৫ ডলার দিয়ে সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি পরিবার। সেখানে ৩০ হাজার লোকের সমাবেশ হবে বলে উদ্যোক্তারা আশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশি অনেক মুসলিম পরিবার এ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। তাদের কাউকে কাউকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিয়েছেন, নিছক ধর্মীয় পরিচয় ও সংহতির জন্য তারা এ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। মুনা বা ইকনার সাথে উপমহাদেশের ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা নিয়ে তারা অতোটা সচেতন বলে মনে হলো না।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৩:৪২
  • ১১:৫৩
  • ৪:২৮
  • ৬:৩৬
  • ৮:০০
  • ৫:০৬