
আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি আমেরিকান অভিবাসীদের মধ্যে পছন্দের রাজ্য বলে পরিচিত মিশিগানে পরিবারসহ বসবাস শুরু করেছি বছর তিনেক পূর্বে। পরিবার বলতে দুই মেয়ে ও তাদের স্বামীরা, সঙ্গে আমার একমাত্র নাতনি।
দিনরাতের কোনো সময়েই ঘুমিয়ে না থাকা শহর নিউইয়র্ক ছেড়ে অপেক্ষাকৃত শান্ত ও কম ব্যস্ততার রাজ্য মিশিগানের স্টার্লিং হাইটসে থাকার সিদ্ধান্ত নেবার বেলা পরিচিত স্বজন ও বন্ধুদের সবাই একবাক্যে বলেছিল, তুমি মিশিগান থাকতে পারবে না।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে মাতামাতি, নয়তো নানা ফোরামে প্রায়শ আড্ডার শহর নিউইয়র্ক ছেড়ে শান্ত মিশিগান রাজ্যে স্বাভাবিক বাস শুরুতে চ্যালেঞ্জ মনে হলেও পরে চেনাজানা কয়েকজন সুশীল ও সাহিত্যমোদিদের সঙ্গ লাভে তা আর চ্যালেঞ্জ মনে হয়নি। স্থায়ীভাবে মিশিগানে থাকলেও নিউইয়র্কের চেনাজানা পরিসর আর আড্ডার ফ্লেভারকে বেশিদিন ভুলে থাকা যায় না। প্রায় ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে মিশিগান যাতায়াত তরুণদের জন্য সহজ হলেও আমার ন্যায় বয়স্কদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের বিমান ‘স্পিরিট’ ছিল ভরসার জায়গা। হলুদ রঙের মাঝারি আকারের প্রায় ৩৬২টি বিমান নিয়ে আমেরিকার বেশ বড় অংশে চলাচলকারী বিমান পরিষেবা সংস্থাটি নিয়ে নানা বয়সীদের মতামত ছিল আকর্ষণীয় ও এড়িয়ে যাবার মতো না।
কেউ কেউ বলতেন, স্পিরিটের বিমানে চড়লে নাকি কানে তুলো গুঁজে দিতে হয়। কারও অভিমত, কথিত বিমান সংস্থার সময়সূচি ও সেবা নির্ভরযোগ্য না। আরও কত কী শুনতাম প্রায়শ! ডলার খরচ করে খাবার-স্ন্যাকস খেতে হয়, এমনকি পানি পর্যন্ত কিনে পান করতে হয়। অথচ দুনিয়াজুড়ে সব সাশ্রয়ী ও কম বাজেটের বিমান সংস্থার সব সেবার ধরন এমনই। ভ্রমণের সময় কোনো ধরনের খাবার বা পানীয় বিনামূল্যে দেওয়া হয় না।
স্পিরিট বিমান সংস্থার নিউইয়র্ক-ডেট্রয়েট ফ্লাইটটি কম মূল্যে ভ্রমণকারীদের নিকট জনপ্রিয় হওয়ার বিশেষ কারণ হলো সার্ভিস ছিল সরাসরি। যাত্রা পথের কোথাও বিমান বদলাতে হয় না। আনুমানিক সোয়া ঘণ্টায় নিউইয়র্ক শহরের একদম মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত লাগোর্ডিয়া বিমানবন্দর থেকে মিশিগান রাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে উড়ে আসে হলুদ পাখির অবয়ব নিয়ে এয়ারবাস এ৩০০ নিও ডিজাইনের প্লেইন।
তবে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো কষ্টের খবর আসে গত ২ মে। ডেট্রয়েট থেকে টেক্সাসের ডালাস শহরে মধ্যরাতে আসা ফ্লাইটটি ছিল এয়ারলাইন্সের শেষ ফ্লাইট। গত ১৫ মে শুক্রবার নিউইয়র্ক আসার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে টিকিট করা ছিল স্পিরিট এয়ারলাইন্সের।
২ মে বিমান সংস্থার দেউলিয়া ঘোষণার খবর শোনার পরপরই আমি তাড়াতাড়ি দ্বারস্থ হই ‘সাউথওয়েস্ট’ নামের আরেকটি মোটামুটি বাজেট মূল্যে কেনা যায় এমন বিমান সংস্থার। যাত্রার দিন বেশি দূরে না থাকায় টিকিটের মূল্য তেমন সাশ্রয়ী ছিল না। তারপরও বিকল্প না থাকায় সাউথওয়েস্ট বিমান সংস্থার আসা ও যাওয়ার টিকিট কিনি।
১৫ মে নিউইয়র্ক যাই শিকাগো হয়ে। ভাগ্য ভালো থাকায় সেই দিনের নিউইয়র্ক যাত্রায় তেমন বিড়ম্বনা হলো না। মনে মনে ভাবলাম, সাউথওয়েস্ট বিমান সংস্থার সেবায় আমরা আবার স্পিরিট এয়ারলাইন্সকে খুঁজে পাব। তবে আমার ধারণা যে শতভাগ সঠিক ছিল না, তা গত ১৮ মে (সোমবার) নিউইয়র্ক থেকে ডেট্রয়েট ফেরত যাত্রায় টের পেয়ে গেলাম। পুরো শনিবার ও রোববার নিউইয়র্ক সিটির লং আইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলায় উপস্থিত হয়ে রাতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসি আমার এক ভাইয়ের বাসায়।
পরদিন দুপুর তিনটায় সাউথওয়েস্টের ডেট্রয়েটের ফ্লাইট। সকাল থেকে নিউইয়র্কের আকাশ একেবারে ঝকঝকে। তাপমাত্রা আশির কোঠায় ফারেনহাইটের হিসেবে। ভাইয়ের বাসায় দুপুরের খাবারে দেশি স্টাইলের পাটশাক—আমরা যেটাকে বলি নাইল্যা শাক—সহ মাছ-ভাত আর সঙ্গে ডাল দিয়ে লাঞ্চ সেরে বেলা দুটোর দিকে লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্টে পৌঁছাই। বর্তমান লাগোর্ডিয়া কিন্তু পূর্বের মতো ছোট্ট নয়। কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিশাল আকার ও আধুনিক সেবায় পরিপূর্ণ। বি ও সি টার্মিনাল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চলাচলকারী সকল বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ দুটোই আজকাল করছে। তবে স্পিরিট এয়ারলাইন্সে হলদে পাখি সদৃশ বিমানের ওঠা-নামার জন্য নির্ধারিত টার্মিনাল এ ছিল আকারে ছোট ও সুবিধাজনক। নিরাপত্তা গেট পেরোলেই মাত্র গোটা বিশেক গেট। সহজে পাওয়া যেত, পৌঁছানো যেত দ্রুত।
টার্মিনাল বি আরও বিশাল পরিসরে। নিরাপত্তা গেট পেরিয়ে দুটো দীর্ঘ এস্কেলেটরে চড়ে সম্ভবত তৃতীয় তলায় উঠতে হয়। তারপর বেশ খানিকটা পথ হেঁটে অবশেষে গেট নম্বর ৫৪-তে। সাউথওয়েস্টের শিকাগোগামী ২৬৫৯ নম্বর ফ্লাইটে। ইতিমধ্যেই বোর্ডে যাত্রার সময় বদলে গিয়েছে। বেলা ৩ টার জায়গায় ৩টা ৪৫ মিনিটে। কিছুক্ষণ পর শুনি ফোনে টুং আওয়াজ। আবারও যাত্রার সময় বদল—বেলা ৪টা ১০ মিনিটে। বিমানে ওঠার ডাক এলো ৩টা ৪৫ মিনিটে। প্রায় দুই শত যাত্রী ও ৬ জন ক্রুসহ বিমানে যথাযথ আসন গ্রহণ ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিমান আকাশে উড়লো বেলা ৪টা ২০ মিনিটে। ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট একটানা উড়াল দিয়ে শিকাগো ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৬৫৯ নম্বর ফ্লাইটটি অবতরণ করলো সন্ধ্যা ৭টায়, ৫ নম্বর গেটে। ডেট্রয়েটগামী ফ্লাইট ছাড়বে ৪৫ মিনিট পর, সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে।
এবার গেট বদল করে দ্রুত পায়ে হেঁটে এলাম ২২ নম্বর গেটে। সামনে তাকিয়ে চমকে উঠি। টার্মিনালের এই অংশে লোকে লোকারণ্য। দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত নেই। কমপক্ষে ১২টি ফ্লাইটের যাত্রী একে অন্যের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। পুরো জায়গায় বসার একটি চেয়ারও খালি নেই। এখানে আবার লাইনে দাঁড়াতে হলো ডেট্রয়েটমুখী ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস নিতে। আমি দাঁড়িয়েছি ১৫-১৬ জনের পেছনে। হলরুমের ডানে-বামে বিমানের হলুদ রঙের বোর্ডে যাত্রার নোটিশ ও গন্তব্যসহ ছেড়ে যাবার সময় দেখাচ্ছে; শুধু ডেট্রয়েটগামী বিমানের কোনো তথ্য নেই। ধীরে ধীরে কাস্টমার সার্ভিস ডেস্কে দাঁড়িয়ে আইডি কার্ড হাতে দেওয়া মাত্র চাইনিজ মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, ‘মিস্টার আহমদ, ইয়োর ফ্লাইট ডিলেড।’ রাত ৯টা ৩০ মিনিটে শিকাগো থেকে উড়বে। কার্ডের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে তো তাই লেখা।
আবারও অপেক্ষার পালা। ভাবছি রাত ১০টা ১৫ মিনিটের পর ডেট্রয়েট পৌঁছালে নির্ধারিত ডাউনটাউনমুখী ডিএক্স বাস—যেটি ডেট্রয়েট বিমানবন্দর ও ডেট্রয়েট ডাউনটাউনে সারাদিন শাটল হয়ে যাতায়াত করে থাকে, সেটি পাব কি না। সুবিধা হলো ডাউনটাউন পৌঁছাতে পারলে মিশিগানের বাঙালি অধ্যুষিত হ্যামট্রামিক বাজার এলাকায় যাওয়া সহজ হয়।
শিকাগো থেকে বিমান ছাড়ার সময় যত দীর্ঘ হচ্ছে, আমার শাটল বাস ধরার সময় ততই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এয়ারপোর্টে অবস্থান করার সময় ৪০ মিনিটের বদলে দুই ঘণ্টার কাছাকাছি হতে চলেছে, তারপরও ডেট্রয়েটমুখী বিমানের কোনো খবর নেই। অবশেষে রাত ১০টার দিকে হলুদ নোটিশ বোর্ডে ভেসে উঠল আমি সহ আরও দেড়শত যাত্রীর কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা। সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের ডেট্রয়েটগামী ২৩৬৯ নম্বর ফ্লাইট আকাশে উড়বে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে। আটলান্টা থেকে যাত্রী নিয়ে উড়ে আসা নীল, হলুদ আর লাল রঙের ক্লাসিক মিশ্রণে সাজানো সাউথওয়েস্টের জেট বিমান ধীরে ধীরে যথারীতি গেটের বাইরে এসে ফের যাত্রার উদ্দেশ্যে দাঁড়াল রাজকীয় ভঙ্গিতে।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের অনেকেই বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট। তারপরও সবাই নীরবে বসে আছেন পরবর্তী যাত্রার অপেক্ষায়। মজার বিষয় হলো, গেটের দায়িত্বে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবয়সী মহিলার নিকট পুরো চিত্র যেন বেশ আমোদের মনে হলো। বোর্ডিং কার্ডে লেখা গ্রুপের নম্বর অনুযায়ী ১৭৫ জন যাত্রী সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ সেই মহিলা মেতে আছে সহকর্মীদের সঙ্গে মজা-তামাশায়।
হঠাৎ করে বিমানের ভেতর থেকে কেউ একজন এসে কিছু বলার পরপরই শুরু হলো তাড়া করে দ্রুত সব যাত্রীদের বিমানে উঠিয়ে দেবার কার্যক্রম। তা দেখে যাত্রীদের মধ্যে শুধু একজন আরেকজনকে চোখের ইশারায় কিছু বলার চেষ্টা করা ছাড়া আর কোনো দিকে পথ মাড়ালেন না। সবার লক্ষ্য বিমানের ভিতরে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট আসনে বসে শুনবেন বিমানের দুটো ইঞ্জিনের গর্জন আর শত মাইল বেগে রানওয়ে ধরে দৌড়ে চলার কাঙ্ক্ষিত চিত্র।
বিমানের ভিতরে প্রবেশ করে শেষ প্রান্তের তিন আসনের সারির জানালার পাশের আসনে বসে আয়েশ করে পিছনে হেলান দিতে না দিতেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম মাটি থেকে কয়েক হাজার মাইল উপরে আকাশের সীমানায়। নিম্নে সুন্দর করে সাজানো উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত শিকাগো শহরের আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা।
সারাদিনের অনাকাঙ্ক্ষিত নানা অঘটনে ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এরই মধ্যে বিমানবালার জিজ্ঞাসা—কোনো পানীয় নেব কিনা? ‘ডায়েট কোক’-এর নাম মুখে এসে গেল কোনো ভাবনা ছাড়াই। বরফ মেশানো ডায়েট কোকে চুমুক দিয়ে মনে হলো, এতক্ষণ যে তৃষ্ণার্ত ছিলাম তা একবারও মনেই আসেনি। বিমান উড়ছে ডেট্রয়েট শহরকে নিশানা করে। ধীরে ধীরে যাত্রার সময় কমে আসতে লাগল। একসময় প্রায় ৪০ মিনিট পরিষ্কার উজ্জ্বল আকাশে উড়তে উড়তে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের জেট বিমান ডেট্রয়েটের ব্যস্ততম বিমানবন্দরের রানওয়েতে হ্যাপি টাচ করল ১১টা ১২ মিনিটে।
বিমান থেকে বেরিয়ে এসে গাড়ির অপেক্ষায় কাটল আরও ৩০ মিনিটের মতো। প্রায় ১ ঘণ্টা পর ভাড়া করা গাড়ি যখন বাড়ির দরজায় দাঁড়াল, সময় বদলানোর পাশাপাশি দিনের তারিখ বদলে এসে গেল ১৮ মে থেকে ১৯ মে ২০২৬ সাল।