বাবা কামরুল ইসলামের সঙ্গে নিহত দুই শিশু সন্তান। ছবি: সংগৃহীত
যে হাত সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, সেই বাবার হাতেই করুণ পরিণতি ঘটল দুই নিষ্পাপ শিশুর। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পারিবারিক কলহের জেরে নিজের ৬ বছরের ছেলে মুহাদ্দিস মিয়া ও সাড়ে ৩ বছরের মেয়ে তুলনা আক্তারকে পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগে ঘাতক বাবা কামরুল হাসানকে (৩২) আটক করেছে পুলিশ।
অভিযুক্ত কামরুল দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া মধুপুর গ্রামের আব্দুল কাদিরের ছেলে। আটকের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজের দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে কামরুলের দাবি, “সংসারে প্রতিনিয়ত পারিবারিক অশান্তি লেগে থাকত। চার সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী ও পরিবারের সাথে ঝগড়া-বিবাদ হতো প্রতিদিন। এই অশান্তি ও ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতেই দুই সন্তানকে মেরে ফেলেছি।” তবে পুলিশ জানিয়েছে, তার এই স্বীকারোক্তি মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গভীর গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার সন্তানদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে বের হন কামরুল। সিলেটে দুই দিন অবস্থান শেষে রবিবার আবার সুনামগঞ্জের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে পরিকল্পনা অনুযায়ী সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের জাওয়াবাজার অতিক্রম করে ডাবর এলাকায় পৌঁছালে ঘুমে অচেতন সাড়ে তিন বছরের কন্যা সন্তান তুলনাকে পানিতে ফেলে দেন। পরবর্তীতে দিরাই মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকার পানিতে ৬ বছরের ছেলে মুহাদ্দিসকেও একইভাবে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান।
পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে কামরুল দাবি করেন, পানিতে ফেলে দেওয়ার আগেই দুই শিশুকেই ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল, যাতে তারা কোনো বাধা বা চিৎকার দিতে না পারে।
দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার পর সোমবার রাতে একা বাড়িতে ফেরেন কামরুল। বাড়িতে ফিরে সন্তানদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ শুরু করেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে কান্না আর নিখোঁজের নাটক সাজিয়ে সবার সহানুভূতি আদায়ের অপচেষ্টা চালান। তবে তাঁর কথাবার্তা ও আচরণে প্রবল অসঙ্গতি লক্ষ্য করে স্থানীয়দের সন্দেহ বাড়ে।
পরবর্তীতে গত বুধবার স্থানীয় জনতা তাঁকে চাপ সৃষ্টি করলে পুরো ঘটনা প্রকাশ পায়। এরপর স্থানীয়রা তাঁকে আটক করে দিরাই থানা পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন।
ঘটনার অনুসন্ধানে মঙ্গলবার শান্তিগঞ্জ উপজেলার বড়কাপন এলাকা থেকে শিশু তুলনা আক্তারের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশ। অন্যদিকে, বুধবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষ্মণশ্রী ইউনিয়নের দেখার হাওর সংলগ্ন সড়কের পাশ থেকে মুহাদ্দিস মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য দুটি মরদেহই সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, “আটক ঘাতক বাবাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। এই নৃসংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে চলছে।”



