পারিবারিক বিরোধ থেকে রাজনৈতিক সংকট

সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির প্রবীণ নেতা মো. নাছির চৌধুরীর দ্বিতীয় স্ত্রী পারভিন আক্তার ও তার ছোট ভাই দিরাই উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে।

এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে নাছির চৌধুরীর অনুসারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একপক্ষে নেতৃত্বে রয়েছেন পার-ভিন আক্তার, অন্যপক্ষে মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শুরুতে পারিবারিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে এ বিরোধ ছড়িয়ে পড়ে বিএনপির রাজনীতিতে। দুই পক্ষের পৃথক সভা-সমাবেশ, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, একে অপরকে বর্জনের ঘোষণা, জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ, সমাবেশকে কেন্দ্র করে ১৪৪ ধারা জারি, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল-সমাবেশ, এমপি পত্মী বাদী হয়ে মামলা দায়ে সব মিলিয়ে দিরাই বিএনপির রাজনীতি এখন টালমাটাল।

এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পাওয়ায় বিএনপির ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পারিবারিক বিরোধ থেকে রাজনৈতিক সংকট:

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে নাছির চৌধুরী পরিবারের অজান্তে পারভিন আক্তারকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রী শেলী বেগম নিঃসন্তান ছিলেন। পারভিন আক্তার ঢাকার উত্তরায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল দুই মেয়ে নাজিয়া চৌধুরী ও নাদিয়া চৌধুরীকে নিয়ে দিরাইয়ে নাছির চৌধুরীর বাসভবনে আসেন পারভিন আক্তার।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীর সেবা-যত্ন করতে তিনি সেখানে থাকতে চাইলে এতে বাধা দেন মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক। ওই সময় মাসুক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে তালাক হয়েছে এবং তালাকপ্রাপ্ত কোনো নারীকে সেখানে একসঙ্গে থাকতে দেয়া সম্ভব নয়। এ ঘটনায় পারভিন আক্তার মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক ও মিলন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুই মেয়েসহ তাকে নির্যাতনের অভিযোগ এনে দিরাই থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। পরদিন নাছির চৌধুরীকে নিয়ে স্ত্রী ও দুই মেয়ে দিরাইয়ের বাসা ছেড়ে ঢাকায় চলে যান।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক ছাত্রদল নেতা আবুল হাসনাত রিপনের বাসায় পরিবারসহ অবস্থান করেন নাছির চৌধুরী। নির্বাচনী প্রচারণায় ভাইয়ের পক্ষে মাঠে সক্রিয় ছিলেন তার তিন ভাই মাসুক চৌধুরী, মিজান চৌধুরী ও মিলন চৌধুরী। নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন নাছির চৌধুরী। বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সংগঠনকে পাশ কাটিয়ে শারীরিকভাবে চলাচলে অক্ষম নাছির চৌধুরীর রাজনৈতিক ও অন্যান্য কার্যক্রম এখন এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী পারভিন আক্তার। পারভিন আক্তারের পক্ষে স্থানীয়ভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সদস্য আবদুর রশীদ চৌধুরী, দিরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবীর তালুকদার। অপরদিকে মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বে রয়েছে আরেকটি পক্ষ। এদিকে দিরাই-শাল্লা আসনে নাছির চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাবে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল অনুসারী দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজান, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরী এবং মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রুমি বলয়ের নেতাকর্মীদেরও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মাসুক চৌধুরীর সঙ্গে একমঞ্চে দেখা গেছে।

প্রকাশ্যে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি: জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অনেকটা নীরব ছিলেন মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক। সম্প্রতি নাছির চৌধুরী ও তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছেএমন অভিযোগে দিরাই উপজেলা ও পৌর বিএনপির ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন পারভিনপন্থি আবদুর রশীদ, আমির হোসেন ও হুমায়ুন কবীর। তবে ওই সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুক চৌধুরী, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান ও প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল চৌধুরীকে আমন্ত্রণ না জানানোয় দলের অভ্যন্তরে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দেয়। সংবাদ সম্মেলনের প্রেস রিলিজে উপজেলা বিএনপির দ্বিতীয় যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবীরের স্বাক্ষর নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এরপর থেকেই দুই পক্ষ পৃথকভাবে সভা-সমাবেশকরতে থাকে। গত ৬ আগস্ট পারভিনপন্থি নেতাকর্মীরা এবং ৮ আগস্ট মাসুকপন্থিরা জুলাই স্মরণ সমাবেশের ডাক দেন।

৬ আগস্ট স্থানীয় থানা পয়েন্টে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন নাছির চৌধুরী। সেখানে তিনি বলেন, “আমার কোনো ভাই নেই, আমি একা।” ৮ আগস্টের সমাবেশ আহ্বানকারীদের বিএনপির কেউ নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে ৮ আগস্টের কর্মসূচি প্রতিহত করতে মাঠে নামেন নাছির চৌধুরীর অনুসারী নেতাকর্মীরা। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পাবেল ও মাসুক বলয়ের নেতাকর্মীরা বিজয় র?‍্যালি ও সমাবেশ করেন। সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, নাছির চৌধুরীর শারীরিক অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে তার স্ত্রী পারভিন আক্তার একটি ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের অভিযোগ, পিএস-এপিএসেরমাধ্যমে দল পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সরকারি বরাদ্দও ‘সিন্ডিকেটের’ মাধ্যমে ভাগ-ভাটোয়ার করা হচ্ছে। এতে দলীয় নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করেন তারা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছির চৌধুরী এমপি। সরকারি বরাদ্দ ভাগ-ভাটোয়ারার অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে তিনি বলেন, দুর্নীতির সুযোগ না পেয়ে কিছু লোক এগুলো বলাবলি করছে।

মামলায় নতুন মোড় : এদিকে নাছির চৌধুরী এমপির অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে গলায় রামদা ধরে বাড়িসহ সম্পত্তি লিখে নেয়ার অভিযোগে দিরাই আদালতে মামলা করেছেন তার স্ত্রী পারভিন আক্তার। মামলায় নাছির চৌধুরীর তিন সৎ ভাইসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি আমলে নিয়ে দিরাই আদালতের বিচারক মো. জসিম তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুক বলেন, দলিল রেজিস্ট্রি করেন সাব-রেজিস্ট্রার।

নামাজের সময়সূচি
  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:০৪
  • ১২:০২
  • ৪:৩৫
  • ৬:৩৬
  • ৭:৫৫
  • ৫:২৩